আসামে শিশুবলি ঠেকাতে পুলিশের গুলি

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

হাঁড়িকাঠে শিশুর গলা কাটতে শান দেওয়া হচ্ছে খড়্গ, তারস্বরে চলছে মন্ত্রোচ্চারণ ও যজ্ঞ, মধ্যযুগীয় বর্বরতার বেনজির সাক্ষী থাকল অসমের ওদালগুড়ি জেলার গণকপাড়া গ্রাম। খবর পেয়েই পৌঁছায় পুলিশ ও আধাসেনা। পুলিশের আর্জিতেও কোনো কাজ হয়নি। থামানো যায়নি তান্ডব। নরবলি রুখতে শেষমেশ গুলি চালাতে হয় পুলিশকে। গুলিতে জখম হয় গৃহকর্তা যাদব চহরিয়া ও তার ছেলে। ভন্ড সাধুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আটক করা হয়েছে পরিবারের অন্য সদস্যদের। অসমের ওদালগুড়ি জেলার কলাইগাঁওয়ের ঘটনা। পুলিশ জানিয়েছে, রৌতার লালবাহাদুর শাস্ত্রী মেমোরিয়াল হাইস্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক যাদব চহরিয়া। স্থানীয় শিক্ষক যাদব চহরিয়ার বাড়িতে বছর তিনেক আগে থেকে থাকতে শুরু করেন তান্ত্রিক রমেশ চহরিয়া। তার নির্দেশেই শিশুবলির আয়োজন করে চহরিয়া পরিবার। তান্ত্রিকের মগজধোলাইয়ে বাড়িতে থাকা বাইক ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় পরিবারের লোকেরাই। প্রতিবেশীরা উন্মত্ত তান্ডব আটকানোর চেষ্টা করলেও কোনো ফল হয়নি। এরপর পুলিশে খবর দেওয়া হলে তাদেরকেও ইটের আঘাত করে ওই শিক্ষক পরিবার। জানা গেছে, মেয়ে আত্মঘাতী হওয়ার দোষ কাটাতে আত্মীয়ের ছেলেকে বলি দিতে উদ্যোগী হয়েছিল অসমের ওই শিক্ষক পরিবার। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, অনেকক্ষণ ধরেই বাড়ির ভেতর থেকে পুজো, মন্ত্রোচ্চারণের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন। ধোঁয়াও বেরোতে দেখেন। বাড়িতে জাঁকজমক করে পুজো হচ্ছে অথচ পাড়ার কেউই আমন্ত্রিত নন। পড়শিদের বিষয়টায় একটু খটকাই লেগেছিল। তাদেরই কয়েকজন কৌতূহলবশত বাড়ির ভেতরে উঁকি মারতেই চমকে ওঠেন। ঘরের মাঝখানে যজ্ঞের আগুন জ্বলছে। আর সেটাকে ঘিরে নগ্ন অবস্থায় বসে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা! ওই শিক্ষক জোরে জোরে মন্ত্র পড়ছিলেন। তার হাতে ধরা ছিল ধারালো একটা অস্ত্র। একটু দূরেই শোয়ানো ছিল বছর তিনেকের এক শিশু, পড়শিদের তখনই সন্দেহ হয় শিশুবলির আয়োজন চলছে ওই বাড়িতে। সঙ্গে সঙ্গে অন্য গ্রামবাসী ও পুলিশে খবর দেন তারা।

অভিযোগ, পুলিশ আসতেই চহরিয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের ওপর ধারালো অস্ত্র, ইট, পাথর নিয়ে আক্রমণ করেন। জেলা শাসক দিলীপ কুমার দাস জানিয়েছেন, আগুন দেখে গ্রামের মানুষ চলে আসেন। বলি দিতে যাওয়া বাচ্চাটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান তারা। তখন চহরিয়া পরিবার ধারালো অস্ত্র, ইটপাথর নিয়ে গ্রামবাসীদের আক্রমণ করে। খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া দুই সাংবাদিকও জখম হন। এরপরই পুলিশকেও আক্রমণ করেন শহরিয়া পরিবারের সদস্যরা। বাধ্য হয়ে পুলিশ গুলি চালায়। তখনই জখম হন যাদব বাবু ও তার ছেলে। তাদের পায়ে গুলি লাগে। বাচ্চাটিকে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, বিজ্ঞানের শিক্ষক যাদব চহরিয়া, তার স্ত্রী, দুই শ্যালক, দুই শ্যালিকা, তাদের ছেলেসহ আটজন প্রথমে নগ্ন হয়ে পুজোয় বসেন। তারপর সবাই মিলে নিজেদের ঘরবাড়ি, মোটরসাইকেলে আগুন লাগিয়ে দেন। এরপর নগ্ন হয়ে পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরা মিলে তান্ডব নৃত্য শুরু করেন। পুজোর শেষে শ্যালিকার তিন বছরের ছেলেকে বলি দিতে উদ্যোগী হন যাদব বাবু। পরিবারের দাবি, যাদব বাবুর মেয়ে অশুভ শক্তির কবলে পড়ে চার বছর আগে আত্মঘাতী হয়। পরিবারের বিশ্বাস, মেয়ের আত্মা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর সে কারণেই যাদব বাবুর স্ত্রী পূর্ণকান্তি চহরিয়া দুই বছর ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। শিশুবলি দিয়ে পুজো না করলে শাপ মুক্তি ঘটবে না। জানা যায়, বানেইরকুচির রমেশ শহরিয়া নামে এক তান্ত্রিক চহরিয়া পরিবারকে নগ্ন হয়ে পুজো ও শিশুবলির বিধান দিয়েছিলেন। তারপরই এমন উদ্যোগ নেয় চহরিয়া পরিবার। পুলিশ জানিয়েছে, আটক করা হয়েছে শহরিয়া পরিবারের সদস্যদের এবং ওই তান্ত্রিককে।

 

"