ছোট্ট সায়মার ওপরের ফ্ল্যাটেই থাকত খুনি

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিশু সামিয়া আক্তার সায়মাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় পুলিশ কুমিল্লার ডাবরডাঙা এলাকা থেকে হারুন অর রশিদ নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে। হারুন সায়মাদের বাড়ি যে ভবনে, সেটিরই আটতলার বাসিন্দা পারভেজের খালাতো ভাই। তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। এক মাস ধরে হারুন আটতলার ওই ফ্ল্যাটেই ছিলেন। হারুন পারভেজের রঙের দোকানে কাজ করতেন। পরিবারসহ ছোট্ট সায়মা থাকত ওই ভবনের ষষ্ঠতলায়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছে গ্রেফতারকৃত হারুন।

এদিকে নৃশংসভাবে সায়মাকে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে তার সহপাঠীরা। সকালে ওয়ারীর সিলভারডেল প্রিপারেটরী স্কুলের সামনে মানববন্ধন করে তারা। পরে সেখানে বিক্ষোভ করা হয়। শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অভিভাবক ও শিক্ষকরা বিক্ষোভে অংশ নেন। এ সময় হত্যার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়। এ ধরনের ঘটনা আর যেন না ঘটে সে ব্যাপারে এখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীরা। ওয়ারী থানার ওসি মো. আজিজুর রহমান এসব তথ্য জানান। পুলিশ বলছে, হারুনই ভবনের অন্য একটি ফাঁকা ফ্ল্যাটে নিয়ে সায়মাকে হত্যা করেছেন। পুলিশ বলছে, ফাঁকা ফ্ল্যাটটিতে নির্মাণকাজ চলছিল। এ কারণে সেখানে কেউ বসবাস করছিল না।

এদিকে, মাত্র তিন দিন আগেও ৭ বছরের শিশু সায়মাকে ঘিরে দিন কাটত বাবা-মায়ের। সারাক্ষণ হাসি-খেলায় মাতিয়ে রাখত পুরো পরিবারকে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আদরের সন্তান সায়মার পোশাক, বই ও ছবি এখন বাবা-মায়ের কাছে শুধুই স্মৃতি। গতকাল দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন সায়মার বাবা আবদুস সালাম। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কান্নায় ভেঙে পড়েন সন্তানহারা বাবা। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে দুইভাবে নির্যাতিত করা হলো। আমি সর্বোচ্চ তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আসামির ফাঁসি কার্যকর চাই। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, যাদের সন্তান আছে তারা এসব কুরুচিপূর্ণ ব্যক্তির কাছ থেকে কীভাবে আপনার সন্তানদের দূরে রাখবেন বিষয়টি ভেবে দেখবেন। আমি আমার মেয়েকে দেখে রাখতে পারিনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মেয়েটা আমার স্ত্রীকে বলে ১০ মিনিটের জন্য বাইরে গেল। এরপর আমার মেয়েটা আর ফিরল না, তাকে নৃশংসভাবে খুন করা হলো।

গত দুই দিন ধরে আমি একফোঁটা পানিও খেতে পারিনি। ঘরে গেলে মেয়ের কাপড়-চোপড়, ছবি দেখে আর ঠিক থাকতে পারি না। আমার পুরো পরিবারটা বিধ্বস্ত হয়ে গেল। ভেজা গলায় মেয়ের স্মৃতিচারণ করে চলেন বাবা আ. সালাম। পরক্ষণেই চোখ মুছতে মুছতে বলেন, আজকের পর যেন ঘটনাটা ধামাচাপা পড়ে না যায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

এর আগে সংবাদ সম্মেলনে ডিবি জানায়, সায়মাকে ছাদ ঘুরিয়ে দেখানোর প্রলোভনে ৮ তলার লিফট থেকে ছাদে নিয়ে যান হারুন অর রশিদ। সেখানে নবনির্মিত ৯ তলার ফ্ল্যাটে সায়মাকে ধর্ষণ করেন। এরপর নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকে সায়মা। মৃত ভেবে সায়মার গলায় রশি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে রেখে পালিয়ে যান হারুন।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনায় বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত কুরুচির পরিচায়ক। মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ ধরনের অপরাধীরা সাধারণত ধর্ষণের পর যখনভাবে এই অপকর্মের কারণে সে বাঁচতে পারবে না তখনই হত্যার মতো ঘটনা ঘটায়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটিয়েছেন ঘাতক হারুন।

তিনি বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন মাকে বলে শিশু সায়মা ৮ তলায় যায়। সেখানে ফ্ল্যাট মালিক পারভেজের একটি বাচ্চা রয়েছে। তার সঙ্গে সায়মা প্রায়ই খেলাধুলা করতে যেত। সায়মা ওই বাসায় গেলে পারভেজের স্ত্রী জানায় তার মেয়ে ঘুমাচ্ছে। সেখান থেকে বাসায় ফেরার উদ্দেশে লিফটে ওঠে সায়মা। সেখানেই সায়মার সঙ্গে দেখা হয় পারভেজের খালাতো ভাই হারুনের। হারুন সায়মাকে লিফট থেকে ছাদ দেখানোর প্রলোভন দেখিয়ে ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে অত্যন্ত পাশবিকভাবে সায়মাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। সায়মা চিৎকার করলে সায়মার মুখ চেপে ধরে ধর্ষণ করে। সায়মাকে নিস্তেজ দেখে গলায় রশি লাগিয়ে টেনে নিয়ে যায় রান্নার ঘরে। সেখানে সিঙ্কের নিচে সায়মার লাশ রেখে পালিয়ে যায়।

আবদুল বাতেন বলেন, আসামি হারুন পারভেজের খালাতো ভাই। তিনি পারভেজের রঙের দোকানে কাজ করে আসছিলেন। সেই সুবাদে ওই বাসাতেই থাকতেন হারুন।

 

"