অবৈধ পার্কিংয়ে বাড়ছে দুর্ভোগ

নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি রাখেন না চালকরা

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীতে তীব্র যানজট এখন প্রতিদিনকার চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তার পাশে অবৈধ গাড়ি পার্কিং ও যত্রতত্র গণপরিবহন থামিয়ে যাত্রী উঠানো-নামানো করায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। অসহনীয় যানজটে চরম দুর্ভোগের শিকার হন নগরবাসী। এ সমস্যা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করছে। আর পার্কিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকলেও রাস্তায় গাড়ি রাখেন মালিক-চালকরা। তবে সমস্যা সমাধানে শিগগিরই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিটি মেয়র। এদিকে, ঢাকা মহানগরের যেসব কার পার্কিংয়ে অবৈধভাবে অন্য স্থাপনা নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা অপসারণে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিককে নোটিশ দিতে রাজউককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ৩ জুলাই বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। নোটিশ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে ওইসব অননুমোদিত স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। যদি ওই সময়ের মধ্যে অপসারণ না করা হয়, তাহলে এক মাসের মধ্যে রাজউককে তা ভেঙে ফেলতে বলা হয়েছে। আর ভাঙার খরচ ভবন মালিকের কাছ থেকে আদায় করতে বলেছেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে, দুর্বিষহ যানজট থেকে নগরবাসীকে কিছুটা স্বস্তি আনতে ঢাকার তিন প্রধান সড়ক গাবতলী থেকে আজিমপুর, সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ এবং কুড়িল থেকে খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত গতকাল রোববার থেকে রিকশামুক্ত করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। যদিও এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়েছেন রিকশাচালকরা। রিকশার বিকল্প বাহন তৈরি না করেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করলে কাক্সিক্ষত সুফল আসবে না বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন এই রুটে রিকশায় চলাচলকারী সাধারণ মানুষ। নগরীর যানজট নিরসনে শুধু রিকশা বন্ধ নয়, গণপরিবহনের সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং বন্ধের দাবি জানান তারা।

রাজধানীতে নির্মিত ১০ তলার ওপরের বহুতল ভবনের পার্কিং স্পেস দখল করে অন্য কাজে ব্যবহার করছে ভবন মালিকরা। একইসঙ্গে কোনো কোনো ভবনের নিচের অংশে পুরোটাই দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে বা পজেশন আকারে অন্যত্র বিক্রি করে দিয়েছে মালিকরা। এসব ভবনের মালিকরা কোনো রকম নিয়ম না মেনে পার্কিং স্পেসে গাড়ি রাখার পরিবর্তে অন্য কাজে ব্যবহার করছেন। যা ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী অপরাধ।

দেখা গেছে, রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক, বাস টার্মিনাল আর আশপাশের এই চিত্র প্রতিদিনের। চার লেনের রাস্তার অনেকটাই দখল অবৈধ পার্কিংয়ে। শুধু তাই নয়, নগরীর বাস স্টপেজ থেকে শুরু করে যাত্রী ছাউনির জন্য বরাদ্দ জায়গাগুলোতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে দূরপাল্লার গাড়ি, প্রাইভেট কার, লেগুনা আর সিএনজি। এতে যানজটের তীব্রতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সড়কপথে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

রাজধানীর উত্তরায় সম্প্রতি চালু হওয়া চক্রাকার বাস চলাচলে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। আর এসবের জন্য উত্তরার বাসিন্দাদেরই দুষলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে চক্রাকার বাস চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। আর এর জন্য আপনারাই দায়ী। মেয়র বলেন, উত্তরায় অনেক চৌরাস্তা থাকার পরও আমরা সেবাটি সঠিকভাবে দিতে পারছি না। গাড়ি বিশেষ করে কার পার্কিংয়ের কারণে ফুটপাত ও রাস্তাগুলো দখল হয়ে আছে। যে কারণে যানজট লেগে থাকে। দ্রুত চক্রাকার বাসগুলো চলাচল করতে পারছে না। তাই আমি মনে করি এটার জন্য দায়ী আপনারা (উত্তরাবাসীরা)। সুন্দর উত্তরা গড়তে ও সুন্দর নগরী গড়তে কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য আপনাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

মেয়র বলেন, ৬০টি অ্যাভিনিউতে কোনো ধরনের হিউম্যান হলার, ইজিবাইক, অটোরিকশা চলবে না। আমরা দেখেছি এগুলো চলাচলের আর প্রয়োজন নেই যদি চক্রাকার বাস সঠিকভাবে চলাচল হয়।

উত্তরায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তে সাধুবাদ জানান ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। তিনি বলেন, এলাকার শৃঙ্খলার স্বার্থে রিকশা-লেগুনা অপসারণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেয়র আমি এজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই।

মোহাম্মদপুরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শিয়া মসজিদ মোড়, কেন্দ্রীয় কলেজ, তাজমহল রোড ও জাপান সিটি গার্ডেনের সামনের রাস্তায় যানজট নিত্যদিনের ঘটনা। অলিগলি ও প্রধান সড়কে যত্রতত্র প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন পার্ক করে রাখায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

এ কারণে পাঁচ মিনিটের পথ এক ঘণ্টায়ও পাড়ি দেওয়া যায় না। অবৈধ পার্কিং ও যত্রতত্র গণপরিবহন থামানোয় এখানকার রাস্তা দিয়ে নিরাপদে হেঁটেও যাওয়া যায় না। এ পথে চলতে গিয়ে তাই দুর্ঘটনার শঙ্কায় থাকেন এলাকাবাসী।

মোহাম্মদপুরে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের বসবাস। ৮০-এর দশকের পর নানা কারণে এ এলাকার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এখানে বিলাসবহুল ভবনের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে দোকানপাট, ব্যাংক-বিমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক-হাসপাতাল, ছোট-বড় শপিং মল, ফাস্ট ফুডের দোকান। যানবাহনের চাপও দিন দিন বাড়ছে।

স্বাধীনতার আগে বিআরটিসির বর্তমান বাস টার্মিনালটি ছিল মোহাম্মদপুরের একমাত্র বাসস্ট্যান্ড। একই জায়গায় মিনিবাস স্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। প্রথম দিকে এখান থেকে ১২নং মিনিবাস আসাদগেট ও ফার্মগেট হয়ে গুলিস্তান এবং ১৩নং মিনিবাস জিগাতলা-সায়েন্সল্যাব ও আজিমপুর হয়ে গুলিস্তান চলাচল করত। একই সময় মোহাম্মদপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটেও গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়। বিআরটিসির রুট নম্বর ছিল ‘৯’। স্বাধীনতার আগে তাজমহল রোড হয়ে শহীদ সলিম উল্লাহ্ রোড (কায়েদে আযম রোড) দিয়ে মাত্র দুটি বড় বাস নিয়মিত চলাচল করত। একটি ছিল বিমানের (পিআইএ) স্টাফ বাস, অন্যটি ছিল ফাতেমা জিন্নাহ স্কুল বাস। দিনে দুবার এগুলো চলাচল করত। প্রাইভেট কার, জিপ, মোটরবাইক, বেবিট্যাক্সি, রিকশা, ঠেলাগাড়ি ছিল খুবই কম। সামান্য কিছু বাইসাইকেলেরও চলাচল ছিল। কিন্তু মোহাম্মদপুরের সেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এখন রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা মোহাম্মদপুর। ভোর থেকেই এখানকার প্রধান প্রধান সড়ক বিশেষ করে তাজমহল রোড, শহীদ সলিম উল্লাহ রোড, নূরজাহান রোড, গজনবী রোড, আওরঙ্গজেব রোড, শের শাহ্ সূরী রোড, কাজী নজরুল ইসলাম রোড, হুমায়ূন রোড ও শাহজাহান রোডে পাল্লা দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। এসব রোডে সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে। এতে এক দিকে এলাকার মানুষকে চলার পথে যানজটের সমস্যা পোহাতে হয়। অন্যদিকে ভয় থাকে ঘটনা-দুর্ঘটনার।

 

"