সেমির পথে আরেক ধাপ

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০

আরিফ সোহেল

ম্যাচের আগে আফগানি বার্তা ছিলÑ আমরাও ডুবব; তোদেরও ডুবাব। কিন্তু তার ছিটোফোঁটাও হয়নি। আফগানিস্তানের অধিনায়কের সেই হুমকি-ধমকি গুঁড়িয়ে একপেশে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। দারুণ জয়ে সেমিফাইনালে স্বপ্ন-প্রত্যাশাকে আরো বড় করেছে বাংলাদেশ। সাকিবময় ম্যাচে বাংলাদেশ আফগানকে হারিয়েছে ৬২ রানের বড় ব্যবধানে। বাংলাদেশের ২৬২/৭-এর জবাবে প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান ২০০ রানেই প্যাকেট। এখন ৭ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট বাংলাদেশের।

টাইগারদের বিপক্ষে শুরুটা মন্দ হয়নি আফগানদের। নির্বিঘœ ছিল ১০ ওভার পর্যন্ত। ৫১ রান করে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে সাকিব যেন ফুটছিলেন। সাউদাম্পটনে উইকেটের পর উইকেট নিয়ে নিজের রং ছড়িয়েছেন। বিশ্বকাপে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ৫ উইকেট তুলে নিয়ে জাত চিনিয়েছেন আফগানদের। ম্যাচে ব্যাটে-বলে বিরল কীর্তি গড়ে জিতে নিয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচের গৌরব। পুরস্কার হাতে সাকিবকে দেখে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৮৩ করেও মুশফিকুর রহিমও হয়তো সগৌরবে হেসেছেন। এর আগে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ভারতের যুবরাজ সিংয়ের গড়া আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হাফসেঞ্চুরি এবং ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও গতকাল সাকিব স্পর্শ করেছেন।

আফগানিস্তানের স্কোর বোর্ডেও ততক্ষণে জমা পড়েছে ৪৮ রান। কিছুটা অস্বস্তির কালোমেঘ জমতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ শিবিরে। ঠিক সেই সময়েই রহমত শাহকে বেছে নিলেন সাকিব। সাকিবকে মিডঅনে মারার চেষ্টা করছিলেন ওই ব্যাটার। প্রস্তুত তামিম ইকবাল অনায়াসেই লুফে নিয়েছেন ক্যাচ। সাকিব-জাদু জমে গিয়েছে ইনিংসের ২৯তম ওভারে। বল হাতে আফগান অধিনায়ককে বোকা বানালেন। ক্যাচার লিটন দাসে তালুবন্দি গুলবাদিন। বিশ্বকাপের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১০০০ রান ও ৩০ উইকেটের ডাবল পূর্ণ করেছেন। একই ওভারে ২ বল পর আবার সাকিব আঘাত। দুরন্ত এক ডেলিভারিতে এবার বোকা বনলেন মোহাম্মদ নবী। ওখানেই শেষ হয়ে গিয়েছে আফগান সব প্রতিরোধ। আসগর আফগানকেও খুব বেশিক্ষণ উইকেট আগলে রাখতে দেননি সাকিব। লোপ্পা বলে ডিপ মিড উইকেটে বানিয়েছিলেন সাব্বির রহমানের ক্যাচ। শেষে সামিউল্লাহ শেনওয়ারি-নজিবুল্লাহ জাদরানের ৮ম উইকেট জুটি খানিকটা ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন। বিপদ হয়ে ওঠা নজিবুল্লাহকেই নিজের পঞ্চম শিকার বানিয়ে হঠাৎ জ্বলে ওঠা আফগানি মশাল নিভিয়ে দিয়েছেন।

ম্যাচে সাকিবের হাফসেঞ্চুরিসমেত দুই রেকর্ড এবং মুশফিকের দায়িত্বশীল ব্যাটিং বাংলাদেশকে অনেকটাই নির্ভার করেছেন। সঙ্গে ম্যাচে ফিরেই মোসাদ্দেক হোসেন ধুম-ধারাক্কা ব্যাটিং বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমীদের মন মাতিয়েছে। ৫০ ওভারে বাংলাদেশ তুলেছে ৭ উইকেটে ২৬২ রান। আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান মুশফিকুর রহিমের নয়নাভিরাম ৮৩ রান ছিল দলের পক্ষে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া সাকিবের বুদ্ধিদ্বীপ্ত ৫১, তামিমের ধীরস্থির ৩৬, মোসাদ্দেকের ঝড়ো ৩৫ রানের সঙ্গে মাহমুদউল্লাহ খেলেছেন ২৭ রানের সময়োপযোগী ইনিংস।

বৃষ্টির কারণে ১০ মিনিট পর শুরু হয়েছিল ম্যাচ। গ্যালারি জুড়ে লাল-সবুজের উচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ছিল সাউদাম্পটনের রোজ বোলের ২২ গজি সীমানায়। টস জিতে বোলিং নিয়েছেন আফগানিস্তান অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব। কালো মেঘে আকাশ ঢাকা থাকলেও বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়েছে নির্বিঘেœই।

তামিমের সঙ্গে এই ম্যাচে ওপেনিংয়ে নেমে ব্যর্থ হয়েছেন লিটন দাস। মুজিব-উর রহমানের বলে আউট হয়ে গেছেন দলকে মজবুত ভিত গড়ে দেওয়ার আগেই। তবে তার আউট নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। টিভি আম্পায়ার আলিম দার বেশ কয়েকবার রিপ্লে দেখার পর মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। লিটনের তেড়ে আসা বলটি হাসমাতউল্লাহ ঝাঁপিয়ে পড়ে যে ক্যাচ নিয়েছেন; তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। টিভি রিপ্লেতে দেখা গিয়েছে লিটনের ক্যাচ লোফার আগে বল মাটি ছুঁয়েছিল।

লিটন বিতর্ক অবসানের পর উইকেটে আসেন সাকিব। দুজনই দেখেশুনে রানে চোখ রাখছিলেন। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিলেন খোলস থেকেও। আগের বলেই মোহাম্মদ নবিকে চার মেরেছিলেন তামিম ইকবাল। পরের বলেই আউট। বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান ভুল শটে ফিরেছে অফ স্পিনারের পরের বলেই। রাউন্ড দ্য উইকেটে করা নবির বলটি তামিম ব্যাকফুটে গিয়ে খেলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে উড়ে যায় মিডল স্টাম্পের বেলস। ৫৩ বলে ৪ চারে ৩৬ রান করেছেন তামিম।

বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের আসন নিয়ে বেশ কাড়াকাড়িই চলছে। চলছে টানাটানি। সেই আসনে আবার উঠেছেন সাকিব। গতকাল ম্যাচে নামার আগে তার সর্বোচ্চ রানের গদি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ছিল ২৩ রান। ওয়ান ডাউনে নেমে তামিমের সঙ্গে সেই কাজটি সহজেই করেছিলেন সাকিব। ডেভিড ওয়ার্নারকে (৪৪৭) পেছনে ফেলে এখন তার ৪৭৬। তবে হাফসেঞ্চুরির পরপরই ফিরে গিয়েছেন একটু অযাচিতভাবেই। আরেকটু হিসেবি হলে আসনটা আরো পোক্ত হতো। এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সাকিবের ষষ্ঠ ম্যাচে এটি পঞ্চম হাফসেঞ্চুরি। এর মধ্যে আছে টানা দুটি সেঞ্চুরি। সাকিব ৬৬ বলে ৫০ করার পর আর এক রান যোগ করে ফিরেছেন স্পিনার মুজিবের ঘূর্ণিতে। প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপে এক হাজার রান পূর্ণ হয়েছে সাকিবের। এই মাইলফলক স্পর্শ করতে তার প্রয়োজন ছিল ৩৫ রান।

টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি খুব কাছ গিয়েও পারলেন না মুশফিক। জাদরানের বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে এক্সটা কাভারে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন সেঞ্চুরি থেকে ঠিক ১৭ রান দূরে। ৮৭ বলে ৪ চার ও এক ছক্কায় ৮৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংসটি সাজান মুশফিক। এর আগে জাদরানকে লং অনের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন মুশফিক। গুলবাদিন নাইবকে ডাউন দ্য উইকেটে খেলতে গিয়ে সাজঘরে ফিরেছেন মাহমুদউল্লাহ (২৭)। তখন ৪৩ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ২০৭ রান। ওপেনিং থেকে পাঁচে নেমে ব্যর্থ হয়েছেন সৌম্য সরকার। মুজিবের বলে এলবিডব্লিউর শিকার হয়েছেন সৌম্য।

১০ ওভারে ৩৯ রানে ৩ উইকেট নিয়ে আফগানিস্তানের সেরা বোলার মুজিব-উর রহমান। গুলবাদিন নাইব দুটি, মোহাম্মদ নবি এবং দৌলত জাদরান পেয়েছেন একটি করে উইকেট। ঢাকঢোল বাজিয়ে রশিদ খান থেকেছেন উইকেটশূন্য।

"