অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে

শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৯, ০০:০০

শাহজাহান সাজু

দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আসছে। ধীরে ধীরে এই কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উন্নত দেশের অর্থনীতির কাতারের দিকে এগোচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরো টেকসই করতে সরকার এরই মধ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান কমিয়ে শিল্প খাতের অবদান বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়ানোর মাধ্যমে কমানো হচ্ছে উৎপাদন খরচ। গত ২০ বছরে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের হার বাড়ছে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব মিলে উন্নত অর্থনীতির দিকে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিগত চার দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে দেশে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাস পাচ্ছে এবং শিল্প খাতের অবদান বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা অনুধাবন সত্ত্বেও বলা যায়, আগামী দিনগুলোতে শিল্পায়নের উচ্চ হার বাংলাদেশের টেকসই ও উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি হবে। বিগত বছরগুলোতে জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান সর্বোচ্চ। তবে শিল্প খাতের অবদানের ক্রমশ বৃদ্ধির ফলে সেবা এবং কৃষি খাতের অবদানে কিছুটা নি¤œমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

এতে আরো বলা হয়, উন্নত অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন। কম খরচে বেশি পণ্য উৎপাদন। ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি। জিডিপির আকারের তুলনায় কর আহরণের পরিমাণ বাড়ানো। বাংলাদেশের অর্থনীতি এরই মধ্যে সেদিকে যাত্রা করেছে। আগামীতে এসব লক্ষ্য আরো বেশি মাত্রায় অর্জনের জন্য সরকার সেভাবে নীতি প্রণয়ন করছে। জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান বৃদ্ধি পেলে স্থায়ী কর্মসংস্থান বাড়ে। কিন্তু কৃষিতে কর্মসংস্থান বাড়ে অস্থায়ীভাবে। যদিও এখনো কৃষিতেই কর্মসংস্থানের হার বেশি। এরা বেশির ভাগই খন্ডকালীন কর্মী। এদের স্থায়ী কাজের জোগান দিতে হলে শিল্প খাতকে চাঙা করতে হবে।

জানা যায়, কর্মসংস্থানের দিক থেকে এখনো সবচেয়ে বেশি রয়েছে কৃষি খাতে। এরপর রয়েছে সেবা খাত ও সর্বশেষ শিল্প খাত। তবে গত ২০ বছরে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের হার বাড়ছে। সেবা খাতের বহুমুখী প্রসার হওয়ায় এ খাতেও কর্মসংস্থান বাড়ছে। তবে কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের হার কমতে শুরু করেছে।

এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সারা বছর তাদের কাজের নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০০১-০২ অর্থবছরে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে কৃষি খাতে নিয়োজিত ছিল ৫১ দশমিক ১ শতাংশ। জানুয়ারি ২০১৮ সালে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী মোট কর্মসংস্থানের ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষি খাত থেকে আসে। গত অর্থবছর পর্যন্ত তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা হবে ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে এ খাতে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ। একইভাবে ২০০১-০২ অর্থবছরে সেবা খাতে কর্মসংস্থানের হার ছিল ৩২ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে হবে ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে ৪০ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ২০০১-০২ অর্থবছরে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের হার ছিল ১৬ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা হবে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে এ খাতে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২২ শতাংশ। ২০০১-০২ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ২০ শতাংশ। এর আগে এর অবদান আরো বেশি ছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষির অবদান কমে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা আরো কমিয়ে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে। তবে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও এ খাতে উৎপাদন বেড়েছে। প্রযুক্তি ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে এ খাতে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। প্রতি বছর গড়ে কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়ছে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ হারে। কৃষির উৎপাদন নির্ভর করে আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পণ্যের দাম পাওয়ার ওপর। এ কারণে এ খাতকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির আসনে ধরে রাখা সম্ভব নয়। এ কারণেই শিল্প খাতের দিকে নজর দিয়েছে সরকার। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিও শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে কৃষি উৎপাদনকে কাজে লাগাতে সরকার কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলছে। এতে কৃষিতে টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে শিল্পের অবদান বাড়ছে। আগে সেবা খাতের অবদান জিডিপিতে অনেক কম ছিল। তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, গ্যাস উৎপাদন ও মোবাইল ফোন সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে এ খাতের অবদান বেড়েছে। ২০০১-০২ অর্থবছরে জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ছিল ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৫২ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ধরা হয়েছে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের জন্য ধরা হয়েছে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ। জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান এখন বেড়ে চলেছে। ২০০১-০২ অর্থবছরে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে এ খাতের অবদান বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ধরা হয়েছে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। জানুয়ারি ২০১৮তে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী মোট কর্মসংস্থানের ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষি খাত থেকে আসছে। এ ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতের অবদান যথাক্রমে ২০ দশমিক ৫ এবং ৩৯ দশমিক শূন্য শতাংশ।

"