সংসদে প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী

শহর ও গ্রামের পার্থক্য কমাতে নানা পদক্ষেপ

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৯, ০০:০০

৩০ লাখ শহীদকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে

সংসদ প্রতিবেদক

শহর ও গ্রামের পার্থক্য কমিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চালনের লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত বহুমুখী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য হ্রাস এবং প্রান্তিক জনগণের সুরক্ষায় আমরা ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। আমাদের উন্নয়ন ভাবনা হচ্ছে সবাইকে নিয়ে উন্নয়ন এবং সবার উন্নয়ন। উন্নয়ন ভাবনার এ আদর্শকে সামনে রেখে আমরা দারিদ্র্যবিমোচন এবং ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে ৩০ লাখ শহীদকে চিহ্নিত করতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরের ৯ মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধে সারা দেশে ৩০ লাখ শহীদকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে এ লক্ষ্যে কাজ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব বীর মুক্তিযোদ্ধার তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজ প্রস্তুতপূর্বক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল বুধবার টেবিলে উত্থাপিত প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে একাধিক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিলের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরো জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকাশিত তালিকার বাইরে যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা থেকে থাকেন তা শনাক্ত করে ওই তালিকায় প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

সংসদ নেতা জানান, ওই তালিকার অংশ হিসেবে বর্তমানে মোট ৫ হাজার ৭৯৫ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম, ঠিকানা সংবলিত পূর্ণাঙ্গ তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে গেজেটভুক্ত বেসামরিক শহীদ ২ হাজার ৯২২ জন, গেজেটভুক্ত সশস্ত্র বাহিনী শহীদ ১ হাজার ৬২৮ জন, গেজেটভুক্ত বিজিবি শহীদ ৮৩২ জন এবং গেজেটভুক্ত শহীদ পুলিশ ৪২৪ জন।

তিনি জানান, একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগিদের হাতে নিহত জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত গণকবরগুলো সংরক্ষণ করার বিষয়ে আমাদের সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি ও গণকবর শনাক্তকরণের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ৪৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে গৃহীত একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে ২৮১টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হবে।

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা অনুধাবন করেছিলেন যে, গ্রামীণ উন্নয়ন ব্যতীত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়। জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত ও সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা রূপকল্প-২০২১ ঘোষণা করি। রূপকল্প-২০২১ এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনের আগে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮, সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এ প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছি। যার স্লোগান হলো আমার গ্রাম আমার শহর। এ লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশে আমরা গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করছি। আমাদের নিবাচনী অঙ্গীকার হলো প্রতিটি গ্রামে আধুনিক শহরের সুবিধা সম্প্রসারণ। এ লক্ষ্যে আমরা গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত এক দশক ধরেই আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশ সফলতা অর্জন করেছে। গ্রামীণ জনগণের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের মানুষের জীবন যাত্রার উন্নয়ন, শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ। দেশের নগর উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে নগর সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আমাদের সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বিগত দুই মেয়াদে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়ন ও কানেক্টিভিটি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্নমেন্ট এবং আইসিটি শিল্পের উন্নয়ন এই চার স্তম্ভের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রম গ্রহণ করে সফল হয়েছি।

তিনি বলেন, মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সফল উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশের সব সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। ইউএন ই-গভর্নমেন্ট উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশকে পেছনে ফেলে ১৫০তম অবস্থান হতে ২০১৮ সালে ১১৫তম অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫০তম। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়।

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা উন্নয়নে নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২০-২০২১ ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-এর আলোকে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জনপ্রশাসনকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে আমরা ই-নথি ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে জনপ্রশাসনে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের ই-নথি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া গণমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করেছি।

 

"