বেঁচে থাকল বাংলাদেশের স্বপ্ন

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০

আরিফ সোহেল

ম্যাচ শেষ। হাসিমুখো সাকিব। মাঠে মাইক্রোফোনে কথা বলছেন। বলাটাই স্বাভাবিক। স্বপ্ন বাঁচানিয়া ম্যাচে সাকিবময় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। তাও ৩২২ রানের টার্গেট সামনে রেখে। অথচ প্রতিপক্ষ সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ। টনটনের এই ম্যাচে এমন একপেশে জয় আশা করেননি খোদ সেঞ্চুরিয়ার সাকিব আল হাসানও। ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার নেওয়া সাকিব স্বীকার করেছেন, ‘এতটা সহজ হবে ভাবিনি। তবে আমার ৩ নাম্বারে নেমে উইকেটে শেষ পর্যন্ত থাকার চেষ্টা করেছি। এটা পেরেছিল; সেখানেই আমি পরিতৃপ্ত। এই অর্ডারে ব্যাটিং করলে যথেষ্ট সুযোগ থাকে দীর্ঘক্ষণ ব্যাটিং করার। এই জয় সম্ভব হয়েছে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এমন জয়ে দারুণ লাগছে।’

বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে আবারও জাগিয়ে তুলে সাকিব আল হাসান ফিরলেন রাজার আসনে। এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান এখন তার। সাকিব নামতে নামতে এক থেকে চলে গিয়েছিলেন পাঁচে। গতকাল ফিরেছেন নিজের আসনে। কাঁটা বিছানো ব্যাটিংয়ের বন্ধুর পথে সাকিব একে একে জো রুট, ডেভিড ওয়ার্নার, রোহিত শর্মা ও অ্যারন ফিঞ্চকে টপকে গিয়েছেন।

একজন ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান হিসেবে সাকিবই ছিলেন বাংলাদেশের স্বপ্ন জাগানিয়া প্রাণদ্বীপ্ত ক্রিকেটার। ব্যাটে বলে তাকে ঘিরেই বাংলাদেশের প্রত্যাশার পারদ উঠছিল আকাশ উচ্চতায়। বিশ্বকাপে প্রথম থেকেই সাকিব ব্যাটে-বলে কথা রেখেছেন। প্রথম ম্যাচে ৭৫; প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ড, সেখানেও ৬৪। পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের ১২১ রান। আর গতকাল করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। গতকাল করেছেন ১২৪* রান। সঙ্গে উইকেট নিয়েছেন ৫টি। বিশ্বকাপে একজন অলরাউন্ডার পারফর্মারের জন্য এমন ফিগার ঈর্ষণীয়। বিশ্বকাপে সবাইকে ছাড়িয়ে সাকিবের রান এখন ৩৮৪।

সাকিব গতকাল খেলেছেন ক্যারিয়ারের ২০১তম ওয়ানডে। সেখানে ছুঁয়ে ফেলছেন ৮ম সেঞ্চুরি। বিশ্বকাপের দ্বিতীয়; সঙ্গে টানা দুই। সৌম্য থিতু হওয়ার পর, তামিমের দুর্ধর্ষ রান আউট; এরপর মুশফিকের হুট করে চলে যাওয়ার পরও চাপ অনুভব হয়নি। বরং সাকিব বিশ্বকাপের নতুন সারথি লিটন দাশকে পেয়ে প্রাণিত হয়েছিলেন। দারুণ জুটিবদ্ধ রানের বুঝাপড়ায় দলকে টেনে তুললেন। ম্যাচে একবার মাত্র সাকিব প্রাণ পেয়েছেন। বাকি সময় ছিলেন রাজার মতো।

বাংলাদেশ জয়ের টার্গেট ৩২২ রান। জিততে হলে ওভার প্রতি রানের দিকে চোখ রাখতেই হবে। ঠিক সেই দিকে চোখ রেখেই তামিম-সৌম্য ব্যাটে অসাধারণ সূচনা। এই জুটি ভাঙার পর দলকে তুলে নিয়েছেন বিজয়ের বন্দর অবধি। পছন্দের ব্যাটিংয়ে নেমে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন সাকিব আল হাসান। অবিশ্বাস্য ফর্মে আছেন সাকিব আল হাসান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩২১ রান তাড়া করতে নেমে নবম ওভারে সৌম্য সরকার ফেরার পর ব্যাট করতে নেমেছিলেন সাকিব। এক প্রান্ত আগলে রেখে বাংলাদেশকে জয়ের পথেই নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশসেরা এ ক্রিকেটার। মুশফিকের সঙ্গে তার পার্টনারশিপটা জমেনি। কিন্তু লিটন দাশে দারুণ জমাট বাঁধে। দলকে এই জুটিই বিজয়ের বন্দরে নিয়ে গিয়েছেন। ১৮৯ রানের পার্টনারশিপ গড়েছেন তারা। এটাই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের জুটি। এর আগে সাকিব-মুশফিকের পার্টনারশিপ ছিল ১৪২ রানে। লিটন দাশ প্রথম ম্যাচেই ৯৪ রানের চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো এক ইনিংস খেলেছেন। তবে তামিম বরাবরের মতোই রক্ষণাত্মক শুরু করেছিলেন। পঞ্চম ওভার শেষে সৌম্য যখন ১১ বলে ১৮ অন্য প্রান্তে তামিমের সংগ্রহ তখন ১৯ বলে ৯। যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন বাজে বল পেলে সৌম্য যতটা সম্ভব রান তোলার চেষ্টা করেছেন। পঞ্চম ওভারে শেলডন কটরেলকে এক চার ও এক ছক্কায় বড় কিছুর ইঙ্গিতও দিয়েছেন এ ওপেনার। নবম ওভারে রাসেলের প্রথম বলে পয়েন্টের ওপর দিয়ে মেরেছেন দুর্দান্ত এক ছক্কা। কিন্তু পরের বলেই স্লিপে ক্রিস গেইলকে ক্যাচ শিখিয়েছেন সেই সৌম্যই। এতে ভেঙেছে দুই ওপেনারের ৫২ রানের জুটি।

তৃতীয় উইকেটে সাকিবের সঙ্গে ৬৯ রানের জুটি গড়ে আউট হয়েছেন তামিম। ১৮তম ওভারে শেলডন কটরেলের সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হন এ ওপেনার। ৫৩ বলে ৪৮ রান করেন তিনি। তামিম আউট হওয়ার পরের ওভারে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছেন মুশফিকুর রহিম (১)। এর পর আর পিছু ফিরে তাকায়ে হয়নি বাংলাদেশকে।

ক্রিস গেইল ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশের সামনে বড় রানের টার্গেট দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। টনটনে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হোপ, লুইস ও হেটমাইয়ারের ব্যাটে তিনশোর গ-ি টপকে গিয়েছিল ক্যারিবিয়ানরা। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩২১ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

স্বপ্নের শুরু করে বাংলাদেশ। ইনিংসের চতুর্থ ওভারেই গেইলকে ড্রেসিংরুমের রাস্তা দেখান সাইফুদ্দিন। ১৩ বল খেললেও কোনো রান না করে ড্রেসিংরুমে ফেরেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং দানব। এরপর সাই হোপ ও এভিন লুইস দ্বিতীয় উইকেটে ১১৬ রানের পার্টনারশিপ গড়ে ক্যারিবিয়ান ইনিংসের ভিত মজবুত করেন। দুজনেই হাফসেঞ্চুরি করেন। তবে মাত্র ৪ রানের জন্য সেঞ্চুরি হাতছাড়া হয় হোপের। ২১২ বলে ৯৬ রানে আউট হন হোপ। লুইস অবশ্য আক্রমণাত্মক ইনিংস খেলে ৬৭ বলে দুটি ছক্কা ও ৬টি বাউন্ডারির সাহায্যে ৭০ রান করেন ক্যারিবিয়ান ওপেনার। তবে ক্যারিবিয়ান ইনিংসে রানের গতি বাড়ান শিমরন হেটমাইয়ার (৫০) অধিনায়ক হোল্ডার ৩৩ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে ৩২১ রান নিশ্চিত করেন। বাংলাদেশের মধ্যে সফল বোলার মোস্তাফিজুর রহমান ও সাইফুদ্দিন। দুজনেই ৩টি করে উইকেট নেন। সাইফুদ্দিন ৪ ম্যাচে ৯ উইকেট। রয়েছেন টপচার্টের ৫ নাম্বারে। একে আমির; নিয়েছেন ১৩ উইকেট। আর ২টি উইকেট পান সাকিব আল হাসান। ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত পারফর্ম করে সাকিব ম্যান অব ম্যাচ; যা বলা হয়েছে শুরুতেই। পরের ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আগামী ২০ জুন।

"