পরোয়ানার তিন সপ্তাহ পর ওসি মোয়াজ্জেম গ্রেফতার

আত্মগোপনে থেকে জামিনের উদ্যোগ, দাড়ি-গোঁফ রেখে ছদ্মবেশের চেষ্টা

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ২০ দিন পর ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে রাজধানীর শাহবাগ থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল রোববার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হাইকোর্ট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে কয়েক ঘণ্টা শাহবাগ থানায় রাখা হয়। এরপর রাতে সোনাগাজী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের অপরাধ অনুয়ায়ী শাস্তির দাবি করেছেন নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার। ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারের পর এমন দাবি করেন নুসরাতের মা।

শিরিন আক্তার বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গ্রেফতারে আমরা সন্তুষ্ট। আমি চাই সে যতটুকু অপরাধ করেছে, তার সে পরিমাণই শাস্তি হোক। আমি চাই নুসরাতে ভিডিও ধারণ ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারসহ নানা অপ্রচারের সঙ্গে আরো কেউ যদি জড়িত থাকে তাদেরও আইনের আওতায় এনে দ্রুত মামলার বিচার ও রায় যেন হয়। তিনি আরো বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনিও স্বজন হারানোর ব্যথা বোঝেন। নুসরাতকে হারিয়ে আমি যে অসহনীয় কষ্ট ও দুঃখের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আজকের নুসরাত হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়া দাঁড় করানোর পাশাপাশি ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গ্রেফতার করার মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও সেই কষ্ট ভোলার চেষ্টা করতে পারব।

অন্যদিকে, পুলিশ হয়েও গ্রেফতারি পরোয়ানা এড়িয়ে ২০ দিন আত্মগোপনে ছিলেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলার আসামি ফেনীর সোনাগাজী থানার আলোচিত সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। উদ্দেশ্য ছিল, যে করেই হোক আদালত থেকে জামিন নেওয়া। এজন্য দাড়ি-গোঁফ বড় করে চেহারাটা পাল্টানোরও চেষ্টা করেছেন। গতকাল কৌশলে আদালত চত্বরে প্রবেশও করেন তিনি। একজন আইনজীবীর মাধ্যমে মামলায় জামিনের আবেদনও করেন। তবে আগে থেকেই তাকে নজরদারিতে রেখেছিল পুলিশ। আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জানান, সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করে প্রথমে শাহবাগ থানায় রাখা হয়। পরে রাতে সোনাগাজী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর জন্য রাখা হয়। গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওসি মোয়াজ্জেম শাহবাগ থানা হেফাজতে ছিলেন।

ফেনীতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাকা-ের শিকার মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দির ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ানোয় অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এক মামলার আসামি সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। গত মার্চ মাসে নুসরাত তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করার পর মোয়াজ্জেম তাকে থানায় ডেকে নিয়ে জবানবন্দি নিয়েছিলেন। সে জবানবন্দি মোবাইলে ভিডিওচিত্রে ধারণ করেন। তার কয়েক দিনের মাথায় নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগ করা হলে তা নিয়ে সারা দেশে আলোচনা শুরুর হয়। তখনই ওই জবানবন্দির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে অধ্যক্ষের কাছে শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে থানায় অভিযোগ দিতে গিয়েছিলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি। ওই সময় নুসরাতের জবানবন্দি ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম। থানায় নুসরাতকে হয়রানির এ ঘটনায় ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে বাদী হয়ে মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

আদালত মামলাটির তদন্ত ভার দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পরে গত মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা তুলে ধরে ২৭ মে পিবিআইয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকেই অভিযান চালিয়েও মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ফেনী ও ঢাকায় বারবার অভিযান চালিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। ফেনী জেলা পুলিশ ঢাকায় এসেও অভিযান চালিয়েছে। তবে মোয়াজ্জেমের কোনো হদিস তারা বের করতে পারেনি। সাময়িক বরখাস্ত করার পর মোয়াজ্জেমকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত করা হয়। সেখানেও পাঠানো হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। তবে মোয়াজ্জেম সেখানে যোগ না দেওয়ায় সেখান থেকেও তাকে গ্রেফতার করা যায়নি।

এর আগে নুসরাত থানায় গিয়ে ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে হয়রানির শিকার হলেও পরে তার মা নুসরাতের মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, সিরাজকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় নুসরাতের মা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। এরপর থেকেই সিরাজ কারাগারে রয়েছেন। তবে কারাগার থেকেই তিনি নুসরাতের পরিবারের ওপর মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। নুসরাতের পরিবার মামলা তুলে না নিলে সহযোগীদের দিয়ে ৬ এপ্রিল গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষের সহযোগীরা।

গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল না ফেরার দেশে পাড়ি জমান নুসরাত।

জামিনের আশায় আত্মগোপনে ছিলেন মোয়াজ্জেম : পুলিশ হয়েও গ্রেফতারি পরোয়ানা এড়িয়ে ২০ দিন আত্মগোপনে ছিলেন ফেনীর সোনাগাজী থানার আলোচিত সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম। তার এই আত্মগোপনে থাকার কারণ ছিল যে করেই হোক আদালত থেকে জামিন নেওয়া। এজন্য দাড়ি-গোঁফ বড় করে চেহারাটা পাল্টানোর চেষ্টা করেছেন। গতকাল ছদ্মবেশে আদালত চত্বরে এসে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদনও করেন। তবে আগে থেকেই তাকে নজরদারিতে রেখেছিল পুলিশ। আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তিনি।

এদিকে হাইকোর্টে দায়িত্বরত ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, ওসি মোয়াজ্জেমের দাড়ি-গোঁফ বড় ছিল। তাই প্রথমে তাকে তারা চিনতে পারেননি। কয়েকবারের চেষ্টায় তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। হাইকোর্টে সোনাগাজী থানার সাবেক এই ওসির সঙ্গে থাকা তার সাবেক গাড়িচালক মোহাম্মদ জাফর জানান, সকাল ১০টায় তারা অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের চেম্বারে যান। সেখান থেকে আদালতে গিয়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলাটির শুনানির জন্য আবেদন করেন। দুপুর ১টার দিকে আবেদনটিতে নম্বর পড়ে। নম্বরটি ছিল ৪২৭৭০। এ সময় তাদের জানানো হয় আজ সোমবার সকাল ১০টায় মামলার শুনানি হবে। জাফর জানান, দুপুরের পর তিনি খাবার খেতে রেস্টুরেন্টে যান। ওই সময়ে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে আসে। শাহবাগ থানার এক পুলিশ সদস্য জানান, ‘ওসি মোয়াজ্জেম হাইকোর্টে এক আইনজীবীর চেম্বারে গিয়েছিলেন। সেখানে ডিবির একটি দল তাকে অনুসরণ করে। তা টের পেয়ে সেখান থেকে কৌশলে বের হয়ে যান মোয়াজ্জেম। পরে শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।’

 

"