অর্থমন্ত্রী অসুস্থ : বাজেট উপস্থাপনে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ ভবনজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

এবারের বাজেট উপস্থাপনে ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। বাজেট বক্তৃতা শুরুর প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর অসুস্থ হয়ে পড়েন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পরে বাজেটের বাকি অংশ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথম বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিকাল ৪টা ১০ মিনিট থেকে ৪টা ৪০ পর্যন্ত ৩০ মিনিট বাজেট বক্তব্য পাঠ করেন। তার বক্তব্য শেষ হতেই সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দীর্ঘক্ষণ টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় হলুদ ও সবুজে ছাপা শাড়ি পরা স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ অন্যরা অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন। বাজেট পেশ উপলক্ষে অধিবেশন কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সংসদ গ্যালারি থেকে ভিআইপি লাউঞ্জ সর্বত্রই ছিল উপচে পড়া ভিড়। বেলা ৩টা ২৫ মিনিটে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিজের জীবনের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনা পড়া শুরু করেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ও দেশের ৪৮তম বাজেটের শিরোনাম ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’।

প্রচন্ড অসুস্থতার কারণে বাজেট বক্তব্য উপস্থাপন ঠিকমতো করতে পারছিলেন না অর্থমন্ত্রী। পাশ থেকে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ উপনেতা, সাবেক কৃষিমন্ত্রী তাকে বারবার সহযোগিতা করছিলেন। কিন্তু বিকাল ৪টার দিকে একটু বেশিই অসুস্থ হয়ে পড়েন অর্থমন্ত্রী। তিনি ওষুধ গ্রহণের জন্য স্পিকারের কাছে ৫-৭ মিনিটের সময় প্রার্থনা করেন। ওই সময়ে উপস্থিত কয়েকজন চিকিৎসক এমপি এসে তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। এ সময় তার চোখে ওষুধ দেওয়া হয়। তার পরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ৫-৭ মিনিট পরে অর্থমন্ত্রী নিজেই বাকি বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানান। এতে অধিবেশনের চিত্রই পাল্টে যায়। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাকি বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের বাকি অংশটুকু উপস্থাপনের জন্য স্পিকারের অনুমতি প্রার্থনা করেন। জবাবে স্পিকার অনুমতি দিয়ে বলেন, আপনি দাঁড়িয়ে বা বসে বাজেট উপস্থাপন করতে পারেন।

বাজেট উপস্থাপনের জন্য ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অর্থমন্ত্রী খুবই অসুস্থ। তার চোখে অপারেশন হয়েছে, ১৫ মিনিট পর পর তার চোখে ড্রপ দিতে হয়। আমারও চোখে অপারেশন হয়েছে, ঠান্ডা লেগে কথা বলতে গেলে কাশি আসে। এটাই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। তার পরও আপনি (স্পিকার) অনুমতি দিলে বাজেটের বাকিটা আমি উপস্থাপন করব।’ এরপর স্পিকারের অনুমতিসাপেক্ষে প্রধানমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন শুরু করলে সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।

তবে বাজেট বক্তৃতার বইয়ের অনেকাংশেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে কিছু বক্তব্যে ছিল। সেটি পাঠ করার সময় প্রধানমন্ত্রী হেসে স্পিকারকে উদ্দেশে করে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, এটি আমার বক্তব্য নয়, এটি হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর। বাজেট বক্তৃতায় যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে; সেটি আমি পড়ব কি না? জবাবে স্পিকার বাজেট বক্তৃতায় যেভাবে রয়েছে, সেভাবেই উপস্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।’ প্রধানমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন শেষ করলে স্পিকার বলেন, বাজেটের অপঠিত অংশগুলো পঠিত বলে গণ্য করা হলো। বাজেট বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করে নিজের চোখে নিজেই ড্রপ দেন। সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে বিরোধী দলের নেতারাও প্রধানমন্ত্রীর আসনের সামনে এসে তার এই দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এর আগে অধিবেশনের শুরুতে অর্থমন্ত্রী শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে কখনো নিজ আসনে বসে এবং দাঁড়িয়ে বাজেট উপস্থাপনের জন্য স্পিকারের অনুমতি চান। শুরুতেই অর্থমন্ত্রীর অনুরোধে বাংলাদেশ শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রামাণ্যচিত্র তুলে ধরা হয়। প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতির ওপর বৈষম্য, শোষণ-বঞ্চনা, এর বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন, পরবর্তী স্বৈরশাসকদের দুঃশাসন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তিন মেয়াদে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সোপানে অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হয়।

এদিকে বাজেট বক্তৃতার আগেই সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতি বছর বাজেট উত্থাপনের আগে রেওয়াজ অনুযায়ী এ বৈঠক সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন পাওয়ার পর বাজেট বিলে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

উৎসবমুখর সংসদে বাজেট বক্তৃতা শুনতে আসেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সংসদে নিজ কক্ষে বসে বাজেট উপস্থাপন প্রত্যক্ষ করেন তিনি। এর আগে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভবনে স্বাগত জানান সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাড়াও প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল, কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাজেট বক্তৃতা প্রত্যক্ষ করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কালো সুটকেস হাতে বেলা পৌনে ৩টায় বাজেট অধিবেশনে প্রবেশ করেন অর্থমন্ত্রী। প্রচন্ড অসুস্থতার মধ্যেও অর্থমন্ত্রী হাসপাতাল থেকে সরাসরি সংসদ ভবনে আসেন। তার পরও তার মুখে ছিল উচ্ছ্বাস। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে দলের সিনিয়র মন্ত্রী ও নেতারা তাকে সহযোগিতা করেন। বাজেট বক্তৃতার মাঝে মাঝে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে উৎসাহ জোগান।

কঠোর নিরাপত্তা : বাজেট পেশ উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় নেওয়া হয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা। বৈধ পাস ছাড়া আর কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি সংসদ ভবন এলাকায়। এমনকি দর্শক গ্যালারিতে পাস ইস্যুতেও ছিল কড়াকড়ি। র‌্যাব-পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিপুলসংখ্যক সদস্য পুরো ভবনে নিরাপত্তা ঘেরাটোপ গড়ে তোলেন। বাজেট বক্তৃতার পরে আমন্ত্রিত অতিথিরা যাতে নির্বিঘেœ বের হতে পারেন; সেজন্য সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার পিজিয়ন হলের গেটটিও খোলা রাখা হয়েছিল।

অর্থ বিল উত্থাপন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাজেট বক্তৃতা শেষ হলে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল নিজেই দাঁড়িয়ে অর্থ বিল- ২০১৯ সংসদে উত্থাপন করেন। সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলি কার্যকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বিলটি উত্থাপন করা হয়। সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিলটি আগামী ৩০ জুন পাস হবে। এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সরকার ও বিরোধীদলীয় সদস্য ৪৫ ঘণ্টা আলোচনা করবেন।

 

"