বলাৎকারের কথা ফাঁস করায় পরানকে হত্যা

মাদ্রাসা শিক্ষক জেলহাজতে

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯, ০০:০০

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি

যশোরের বেনাপোল কাগজপুকুর খেদাপাড়া হিফজুল কোরআন এতিমখানা মাদ্রাসার ছাত্র শাহ পরান (১২) হত্যা মামলার প্রধান আসামি একই মাদ্রাসার শিক্ষক ও মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদের ইমাম হাফেজ হাফিজুর রহমানকে (৩৫) ১০ দিন পর গত মঙ্গলবার রাতে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বলাৎকারের কথা ফাঁস করায় শাহ পরানকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেছে শিক্ষক হাফিজুর। গতকাল বুধবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যশোর আদালতে পাঠানো হয়েছে। নিহত মাদ্রাসাছাত্রের বাবা কাগজপুকুর গ্রামের শাজাহান আলী ঘাতকের ফাঁসি দাবি করেছেন।

গত ২ জুন বিকেলে শার্শা উপজেলার গোগা গাজীপাড়া গ্রামের হাফেজ হাফিজুর রহমানের বাড়ির খাটের নিচ থেকে মাদ্রাসাছাত্রের গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আটক হাফেজ হাফিজুর রহমান গোগা গ্রামের মৃত মজিদ মোল্যার ছেলে। এ ঘটনায় গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় যশোরের নাভারণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জুয়েল ইমরান শার্শা থানায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, শাহ পরানের হত্যার পর শিক্ষক হাফিজুর পলাতক ছিল। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে হাফিজুর রহমান জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাকে আটকের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান পরিচালনা করলেও সে বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকে। অবশেষে মঙ্গলবার রাতে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার দিঘলিয়া আরাবিয়া কওমি মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি আরো জানান, গ্রেফতার আসামির স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, রমজান শুরু হওয়ার তিন-চার দিন আগে রাতে আসামি তার মাথা টিপে দেওয়ার জন্য শাহ পরানকে তার কক্ষে ডাকে। শাহ পরান তার কক্ষে গিয়ে মাথা টিপতে টিপতে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে। ওই রাতে শাহ পরানকে বলাৎকার করে হাফিজুর। বিষয়টি শাহ পরান পরের দিন তার সহপাঠী এবং মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির কাছে প্রকাশ করে দেয়। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে হাফিজুর কৌশলে মাদ্রাসা থেকে শাহ পরানকে নিজ বাড়িতে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে লাশ ঘরের চৌকির নিচে রেখে পালিয়ে যায়।

এদিকে হত্যাকা-ের পরপরই শার্শা থানার পুলিশের বিরুদ্ধে গ্রেফতার বাণিজ্যের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। আসামি হাফিজুর রহমানের গ্রেফতার ও তদন্তের নামে নিরীহ নারী-পুরুষদের বাড়ি থেকে থানায় নিয়ে তিন দিন আটকের পর ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধান আসামি হাফিজুর রহমানের ভগ্নিপতি শার্শার ডুবপাড়া গ্রামের মসজিদের ইমাম হেদায়েত উল্লাহ (৫০)। ভুক্তভোগীর আত্মীয়রা জানান, ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি হয়। তিন লাখ টাকা ঈদের দিন দিলে শার্শা থানা তাদের রাতে ছেড়ে দেয়। আর বাকি তিন লাখ টাকা ঈদের পর দেওয়া হবে মর্মে একটি ইসলামী ব্যাংকের চেকও নেওয়া হয়। হেদায়েত উল্লাহসহ তার বাড়ির তিনজন গৃহবধূ জানান, ২ জুন প্রধান আসামিকে ধরার জন্য তাদের বাড়ি থেকে তার স্ত্রী রেশমা খাতুন (৩৫), মুক্তাসুন বিল্লাহর স্ত্রী চায়না বেগম (২৫), হাফিজুর রহমানের স্ত্রী হাসিনা বেগমসহ (২৮) চারজন ও যশোর চৌগাছা থেকে মোনাইম (৪৫) নামে আরো একজনকে শার্শা থানা পুলিশ ধরে নিয়ে আসে। প্রধান আসামির অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এভাবে দুদিন আটক রাখার পর হত্যাকা-ে সম্পৃক্ততা না পেয়েও ছেড়ে দেওয়ার জন্য টালবাহানা করতে থাকে পুলিশ। পাশাপাশি চলে অর্থ লেনদেনের দরকষাকষি।

হেদায়েত উল্লাহ বলেন, জমি বিক্রি করে অগ্রিম তিন লাখ টাকা শার্শা থানার দালাল সৈয়দ আলীর (সৈয়দা) মাধ্যমে শার্শা থানার এসআই মামুনের কাছে দিলে ঈদের দিন বিকেলে তিনজন মহিলা ও ঈদের দিন রাতে এশার নামাজের পর আমাদের দুজনকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঈদের পর আরো তিন লাখ দিতে এবং আসামি হাফিজুরের অবস্থান জানানোর শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয়।

হেদায়েত উল্লাহর ভগ্নিপতি ওয়াহেদ মুঠোফোনে জানান, ওসমান ও ইসরাফিলের কাছ থেকে জমি বিক্রির অগ্রিম ৩ লাখ টাকা ৫ জনকে আটকের দিন এবং ঈদের পর রোববার আরো ৩ লাখ টাকার ইসলামী ব্যাংকের একটি চেক দিয়ে আসি।

পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে সহকারী পুলিশ সুপার জুয়েল ইমরান বলেন, আমিও শুনেছি। কিন্তু যাদের কাছ থেকে অর্থ-বাণিজ্য হয়েছে, তাদের আমি ডেকে জিজ্ঞাসা করলে এর কোনো সত্যতা মেলেনি।

 

"