ঘুষ কেলেঙ্কারি

গ্রেফতার হতে পারেন বাছির-মিজান

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

পুলিশের ‘বিতর্কিত’ উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। ঘুষ নেওয়ার একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস করেছেন ডিআইজি মিজান নিজেই। যে অডিও রেকর্ডটি ফাঁস হয়েছে সেটা নিজের নয় বলে গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন এনামুল বাছির। তিনি বলছেন, ওই রেকর্ডটি ভুয়া। তাকে ফাঁসাতেই ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছেন ডিআইজি মিজান।

এদিকে ঘুষ লেনদেন কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার দুদিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা না হওয়ায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিভিন্ন মহলে এ দুজনকে গ্রেফতারের দাবি উঠেছে। তবে ঘুষ লেনদেন কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদক পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে গতকাল পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুষ দেওয়াই প্রমাণ করে ডিআইজি মিজান অবৈধ সম্পদের মালিক। তারা বলেন, ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে শুধু সাময়িক বরখাস্তই দুদকের ওই পরিচালকের জন্য যথেষ্ট নয়। তার বিরুদ্ধে দুদক আইনে মামলা করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে ঘুষ দেওয়ার জন্য ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন বলেন, ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে কোনো ব্যক্তিকে শুধু সাময়িক বরখাস্ত করাই সমাধান নয়। ঘুষ গ্রহীতা এবং ঘুষ গ্রহণকারী দুজনেই সমান দোষে দুষ্ট। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত। যেহেতু এখানে আপসের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন হয়েছে, তাই ডিআইজি মিজানও অপরাধী। এ জন্য তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, দুদকের অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুধু মামলা নয়, দ্রুত তাকে গ্রেফতার করা উচিত। তিনি বলেন, দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ খুব গুরুতর। দুদক যেহেতু স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তাই তার অভ্যন্তরীণ তদারকির বিষয়টি আরো জোরালো হওয়া উচিত। দুদকের ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হতে পারে এমন কোনো কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

এদিকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে যে অডিও রেকর্ডটি ফাঁস হয়েছে, সেটি নিজের নয় বলে দাবি করেছেন ঘুষ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত দুদকের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। গতকাল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই দাবি করেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাছির বলেন, ‘ওই রেকর্ড আমার নয়। ওই রেকর্ড ভুয়া। সে (ডিআইজি মিজানুর রহমান) আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।’ ডিআইজি মিজান কেন ষড়যন্ত্র করবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে কেন তদন্ত হচ্ছে সেটার জবাব দেন। যে রেকর্ড ফাঁস হয়েছে সে কণ্ঠ আমার না। ফাঁস হওয়া রেকর্ডের কণ্ঠ আমার না, সেটাই আমি বলতে পারি।’

ডিআইজি মিজান গত রোববার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তার বিষয়ে দায়িত্ব পাওয়া দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা এনামুল বাছির তাকে অভিযোগ থেকে রেহাই দেওয়ার কথা বলে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। বাছির বিভিন্ন সময় তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাকে জানিয়েছেন। অভিযোগের পক্ষে দুজনের মোবাইল ফোনের কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপ সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন মিজান। তিনি আরো জানান, মামলা থেকে তার দায়মুক্তির জন্য দুদক কর্মকর্তা বাছিরের সঙ্গে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। যার মধ্যে গত ১৫ জানুয়ারি রমনা পার্কে বাজারের ব্যাগে করে ২৫ লাখ টাকা নিয়েছেন দুদক পরিচালক। আর বাকি ২৫ লাখের মধ্যে গত ১ ফেব্রুয়ারি দেন ১৫ লাখ।

নিজেদের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরপরই রোববার দুদক সচিব ড. মুহাম্মদ দিলওয়ার বখ্?তকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কমিশন। কমিটিকে এক কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলে গত সোমবারই কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে এনামুল বাছির ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি (এনামুল বাছির) অনুসন্ধান চলাকালে তদন্তের তথ্যসংশ্লিষ্ট অভিযুক্তের (ডিআইজি মিজান) কাছে সরবরাহ করেছেন, যা দুদকের চাকরি বিধিমালা অনুসারে অপরাধ। এ জন্য তার বিরুদ্ধে (এনামুল বাছির) বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

ঘটনার পর দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ জানিয়েছেন, অন্যায় করে কেউ ছাড় পাবে না। শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও তথ্য পাচারের অভিযোগে এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে আলাদা বিভাগীয় তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, ঘুষ দেওয়াও ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে। ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুদক মামলা করবে। তিনি আরো জানান, ডিআইজি মিজানুর রহমানের দুর্নীতি তদন্তে বাছিরের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।

ঘুষ লেনদেন যেভাবে : দুদক কর্মকর্তার সঙ্গে ডিআইজি মিজানুর রহমানের ফাঁস হওয়া ফোনালাপেও উঠে আসে ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার পুরো ঘটনা। এ ছাড়া সিসিটিভির ফুটেজে পুলিশ প্লাজায় মিজানুর রহমানের স্ত্রীর দোকানে মিজানুর রহমানের সঙ্গে এনামুল বাছিরকে সাক্ষাৎ করতেও দেখা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারের চাপে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া যায়নি বলে ডিআইজি মিজানকে জানান দুদক পরিচালক এনামুল বাছির। ফোনালাপে এনামুল বাছির বলেন, ‘চেয়ারম্যান এবং কমিশনারের চাপে বাধ্য হয়েছি এ ধরনের রিপোর্ট দিতে। আপনি একটি জিনিস বুঝেন, আমি কিন্তু এক সপ্তাহ আগে রিপোর্ট দিয়েছি। কোনো মিডিয়ায় কি কোনো কথা আসছে! আপনি যদি চান ফেরত নিতে পারেন। আমি যখন চেয়ারম্যানকে বললাম, পারলে তো তিনি আমাকে মারে।’

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তদন্ত : এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত বছর জানুয়ারিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে ডিআইজি মিজানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। এরপর গত বছরের ৩ মে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ডিআইজি মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। প্রথমে অনুসন্ধান কর্মকর্তা ছিলেন দুদকের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। পরে এই দায়িত্ব পান পরিচালক এনামুল বাছির। প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মিজানুর রহমান ও তার প্রথম স্ত্রী সোহেলিয়া আনারের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। মিজানুরের নামে ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ১৯১ টাকা এবং স্ত্রীর নামে ৭২ লাখ ৯০ হাজার ৯৫২ টাকার অসংগতিপূর্ণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পায় দুদক।

পরে দুদকের পরিচালক এনামুল বাছির গত ২৩ মে কমিশনে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে বলা হয়, ডিআইজি মিজানের ৪ কোটি ২ লাখ ৮৭ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারাসহ ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ৪(২) ধারায় মামলার সুপারিশ করা হয়।

অন্যদিকে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ অনুবিভাগের দায়িত্বে ছিলেন দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। খন্দকার এনামুল বাছির ১৯৯১ সালে অ্যান্টি করাপশন অফিসার (এসিও) হিসেবে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে যোগ দেন। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হওয়ার পর তিনি সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক ও পরে পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান।

 

"