বেপরোয়া রোহিঙ্গারা ব্যস্ত খুনোখুনিতে

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০

কক্সবাজার প্রতিনিধি

নিজ দেশে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গারা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ইয়াবা, মানবপাচার ও হাটবাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের অভ্যন্তরে একাধিক গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় হামলা ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। চলছে অস্ত্রের মহড়াও। গত ৭ জুন পর্যন্ত তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে খুন হয়েছে ৩৮ রোহিঙ্গা। তা ছাড়া বাড়ছে অপহরণ, ধর্ষণসহ নানা অপরাধও। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন।

তার মতে, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের আবাসন এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় তারা অনায়াসে ক্যাম্প থেকে যখন-তখন বের হচ্ছে। এভাবে নানা উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। কোনোভাবে দেশের আনাচে-কানাচে তারা ভীত গাড়তে পারলে জড়াতে পারে নানা অপরাধেও। তার আইডেনটিটি না থাকায় অপরাধ করে সহজে আত্মগোপনে যেতে পারার সম্ভাবনা শতভাগ। তবে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে স্থায়ী হওয়া কিংবা ভিন্ন কোনো রাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় অনেক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ প্রতিদিন ক্যাম্প ছাড়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আর ক্যাম্প ত্যাগ করে নানাভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বা জেলার চেকপোস্টগুলোতে আটক হয়ে গত দেড় বছরে প্রায় ৫৬ হাজার রোহিঙ্গাকে ক্যাম্পে ফেরত আনা হয়েছে।

এদিকে, স্থানীয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের ভাষ্য, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত ও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে শিবিরগুলোকে অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে।

পুলিশসহ স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরে সাতটি করে সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। এর মধ্যে টেকনাফের আবদুল হাকিম বাহিনী বেশি তৎপর। এই বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য যখন-তখন লোকজনকে অপহরণ করে। মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করে লাশ গুম করে। ইয়াবা, মানবপাচারে যুক্ত থাকার পাশাপাশি এ বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা নারীদের তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটায়। ২০১৬ সালের ১৩ মে টেকনাফের মুছনী রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায় হাকিম বাহিনী। এ সময় আনসার কমান্ডার আলী হোসেন তাদের গুলিতে নিহত হন। তারা লুট করেছিল আনসারের ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৭ শতাধিক গুলিও।

পুলিশের তথ্য মতে, টেকনাফের বিভিন্ন শিবিরে আরো একাধিক বাহিনী তৎপর রয়েছে। ছাদেক, হাসান, নুরুল আলম, হামিদ, নুর মোহাম্মদ ও গিয়াসের নেতৃত্বে ১০-২০ জনের সদস্য নিয়ে বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। তাদেরও ছয়জন খুন হয়েছেন। অন্য সদস্যরা আত্মগোপন করায় বাহিনীর তৎপরতা এখন শিবিরে নেই।

অন্যদিকে উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়েরের মতে, উখিয়ার বিভিন্ন শিবিরেও রোহিঙ্গাদের একাধিক বাহিনী সংগঠিত হতে চেয়েছিল। আমাদের কঠোরতার করণে তারা দাঁড়াতে পারেনি। এসব বাহিনীর সদস্যরা ইয়াবা কারবার ও মানবপাচারে সক্রিয় রয়েছে। আমরা তাদের শনাক্ত ও ধরতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

পুলিশের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৭ জুন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রায় ৩৮ জন রোহিঙ্গা। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬, মার্চে ১০, এপ্রিলে ৪, মে মাসে ৫ জন ও সাত জুন পর্যন্ত ৫ জন। টেকনাফ পুলিশের ভাষ্য, ৩৮ রোহিঙ্গার মধ্যে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২১ জন। নিহতদের অধিকাংশ ইয়াবা কারবারি ও মানবপাচারকারী।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম জানান, উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে পুরোনো-নতুন মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯১৩ জন। তালিকাভুক্ত প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবনধারণ পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের দেওয়া অনেক পণ্য তারা বাজারে বিক্রিও করে দিচ্ছে। এর পরও গোপনে বা কৌশলে ক্যাম্প ছাড়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা। মানবিক আশ্রয় দেওয়ার কারণে সরকার তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করছে। এটার সুযোগ নিলে প্রশাসনকে আরো কঠোরতা দেখাতে হয়।

অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে প্রত্যাবাসন কমিশনার বলেন, যেসব রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ বেড়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলও বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পভিত্তিক মাদকের সঙ্গে বেশি জড়াচ্ছে বলে খবর পাচ্ছি। এটি নিয়ন্ত্রণেই তারা গ্রুপ সৃষ্টি করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। শৃঙ্খলা বাহিনীর সব শাখা এসব বিষয় মাথায় রেখেই ক্যাম্পে কাজ করছে। যেকোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

 

"