ঘুষকাণ্ডে বরখাস্ত দুদক পরিচালক বাসির

* কাজটি করেছি তাকে ফাঁসাতে : ডিআইজি মিজান * একাধিক অডিও ফাঁস

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও তথ্য পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসিরকে সাময়িক বরখাস্ত করছে দুদক। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তার বিষয়ে বলা হয়, দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসির ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অনুসন্ধান থেকে দায়মুক্তি দিতে তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণে সমঝোতা করেন। তিনি ৪০ লাখ টাকার মধ্যে ২৫ লাখ টাকা রমনা পার্কে, বাজারের ব্যাগে করে মিজানুর রহমানের কাছ থেকে গ্রহণ করেন এবং অবশিষ্ট ১৫ লাখ টাকা পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে পাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ছেলেকে স্কুলে আনা- নেওয়ার জন্য তিনি গ্যাসচালিত একটি গাড়ি দাবি করেন। এ ছাড়া তিনি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবৈধভাবে পাচার করেন। নারী নির্যাতনের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হওয়া পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করেছিল দুদক। কিন্তু এই তদন্ত করতে গিয়ে দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিজানুর রহমান। এদিকে, দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাসিরের ‘চাপের পর’ তাকে ‘ফাঁদে ফেলতে’ অপরাধ জেনেও ?ঘুষ লেনদেনের কাজটি করেছেন বলে দাবি করেছেন পুলিশের এই ডিআইজি। যে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে দেওয়ার দাবি তিনি করেছেন, তার হিসাবও দুদককে দেওয়ার জন্য তৈরি আছেন। তবে ঘুষ দেওয়ার প্রমাণ মিললে বিচারের আওতায় ডিআইজি আসবেন মিজানও।

দুদক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তোলার পর তা নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যেই গতকাল নিজের অবস্থান প্রকাশ করেন ডিআইজি মিজান। নানা ঘটনায় আলোচিত ও বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তার ‘অবৈধ সম্পদ’র অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন দুদকের পরিচালক এনামুল বাসির। ডিআইজি মিজান দাবি করেছেন, ঘুষ দেওয়া যে অপরাধ তা জেনেই তিনি কাজটি করেছেন ‘বাধ্য হয়ে’।

তিনি বলেন, আমি তাকে টাকা দিতে চাইনি। কিন্তু তিনি যেভাবে প্রেসার দিচ্ছিলেন, বাধ্য হয়ে তাকে ধরতে ফাঁদে ফেলতে এই কাজটি করতে হয়েছে। এটা আমি বুঝেশুনে করেছি, তাকে ফাঁসানোর জন্য করেছি এবং নিজের সেইফটির জন্য করেছি। তার অবৈধ সম্পদ অর্জনের কোনো প্রমাণ না পাওয়ার পরও দুদক কর্মকর্তা বাসির চাপ দিচ্ছিলেন বলে দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ জানান, ডিআইজি মিজানের দুর্নীতি তদন্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে এনামুল বাসিরকে বরখাস্ত করা হয়নি বলেও জানান দুদক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কমিশনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও তথ্য পাচারের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করা হবে।

জানা যায়, মাস ছয়েক ধরে দুজনের মধ্যে এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথমে ২৫ লাখ ও পরে ১৫ লাখ টাকা দিয়েছেন মিজানুর। কিন্তু ২ জুন খন্দকার এনামুল বাসির মিজানুরকে জানান, তিনি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারের চাপে তাকে অব্যাহতি দিতে পারেননি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিজানুর টাকা-পয়সা লেনদেনের সব কথা ফাঁস করে দেন। প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন এনামুল বাসিরের সঙ্গে কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ড। এ বিষয়ে গত রোববার প্রতিবেদন প্রচার করে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল।

এনামুল বাসির অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অডিও রেকর্ডটি বানোয়াট। তিনি টাকা-পয়সা নেননি। তিনি গত মাসের শেষ দিকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন এবং মিজানুরের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছেন। মিজানুর রহমান বলেছেন, তিনি খন্দকার এনামুল বাসিরকে একটা স্যামসাং ফোন কিনে দিয়েছিলেন শুধু তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। তার গাড়িচালক হৃদয়ের নামে সিমটি তোলা। এতে দুজনের কথা ও খুদে বার্তা বিনিময় হয়েছে।

ডিআইজি মিজানুর ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত জানুয়ারির শুরুর দিকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারকে গ্রেফতার করানোর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। তখন তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠে। মিজানুরের বিরুদ্ধে এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় জিডি রয়েছে। গত বছরের ৩ মে অবৈধ সম্পদসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে মিজানুরকে দুদক কার্যালয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মিজানুর রহমান ও তার প্রথম স্ত্রী সোহেলিয়া আনারের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। মিজানুরের নামে ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ১৯১ টাকা এবং স্ত্রীর নামে ৭২ লাখ ৯০ হাজার ৯৫২ টাকার অসংগতিপূর্ণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা দুদকের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তদন্ত শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায় দুদক পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার এই অভিযোগ পাওয়া গেল। এনামুল বাসির বলেন, মিজানুরের স্ত্রীর বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি দোকানে গিয়েছিলেন।

 

"