আসছে নতুন ভ্যাট আইন

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০

শাহজাহান সাজু

অবশেষে ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে বহুল আলোচিত নতুন মূল্যসংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইন আসন্ন অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নে যাচ্ছে সরকার। আইনটি বাস্তবায়িত হলে বাড়বে রাজস্ব আয়, ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হবে ভ্যাটের জাল। নতুন আইনে ভ্যাটের একক হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) টানাপড়েন চললেও একক হার আর থাকছে না। নতুন আইনে ভ্যাটের হার বা স্তর থাকছে ৫টি। আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা যায়, কয়েক অর্থবছর ধরেই নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের তোড়জোড় চালিয়ে আসছে এনবিআর। কিন্তু ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে আইনটি দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়। তা ছাড়া এর আগেও কয়েক দফা পিছিয়ে দেওয়া হয়। এবার ব্যবসায়ীদের বাগে এনে আগামী অর্থবছর থেকে সরকার বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে নতুন এ আইনটি। আইনে ভ্যাটের হার ৭ স্তর থেকে কমিয়ে ৫ স্তরে নামিয়ে আনার ঘোষণা থাকছে। ভ্যাটের নতুন স্তরগুলো হচ্ছেÑ ২, ৫, ৭ দশমিক ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ সর্বনিম্ন ২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে ভ্যাটের হার বা স্তর। এ ক্ষেত্রে পণ্যের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ, উৎপাদনে ১০ শতাংশ, পাইকারি পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট রাখা হবে। পেট্রোলিয়াম ও নির্মাণসামগ্রীর অন্যতম উপকরণ রড, মসলা, কাগজসহ বেশ কিছু পণ্যে সর্বনিম্ন হারে ২ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করা হচ্ছে। পুরোনো আইনে ভ্যাটের ৭ স্তর ছিল ২, ৩, ৪ দশমিক ৫, ৫, ৭, ১০ ও ১৫ শতাংশ।

সূত্র আরো জানায়, বছরে ৫০ লাখ টাকার কম লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানকে কোনো ভ্যাটই দিতে হবে না। অর্থাৎ নতুন আইনে ভ্যাটমুক্ত সীমা বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ৫০ লাখ ১ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হবে। এ ছাড়া সম্পূরক শুল্ক এগারোটি স্তরের পরিবর্তে ৮টি স্তর নির্ধারণ করা হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে নতুন ভ্যাট আইনে ১ হাজার ৯৮৩টি পণ্যকে করের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মৌলিক খাদ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহন, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মাছ চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বছরে ৫০ লাখ টাকার কম লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট দিতে হবে না। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেওয়া প্রতিষ্ঠানের জন্য রাখা হচ্ছে রেয়াতি সুবিধা।

সূত্র জানায়, নতুন আইনে অনলাইনে রিটার্ন জমা, ভ্যাট পরিশোধসহ যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেও সীমিত পরিসরে অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট রিটার্ন জমা, ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দিয়ে আপাতত নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। কারণ বর্তমানে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের যে অবস্থা, তাতে অটোমেশনের কাজ শেষ হতে আরো অনেক সময় লাগবে। এ জন্য ভ্যাট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোমেশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া এই আইন কার্যকর করা কঠিন হবে। আর আগের আইনের প্যাকেজ ভ্যাটপ্রথা থাকলেও নতুন ভ্যাট আইনে তা থাকছে না।

এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এক কর্মশালায় বলেছেন, নতুন আইনে যারা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেবেন, আসলে তারাই রেয়াত পাবেন। এই শ্রেণি সাধারণত বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে তারা প্রকৃত ভ্যাট সিস্টেমে থাকবেন। অন্যদিকে, ১৫ শতাংশের নিচে অর্থাৎ ৫, ৭.৫ ও ১০ শতাংশ হারে যারা ভ্যাট দেবেন তারা রেয়াত সুবিধা পাবেন না। এ পদ্ধতি প্রকারান্তরে আবগারি প্রথা চালুর শামিল, যা ভ্যাট আইনের পরিপন্থী। অর্থাৎ একপক্ষ রেয়াত পাবেন, অন্যপক্ষ রেয়াত পাবে না। একই আইনে দুই পদ্ধতি চালু করা হলে ট্যাক্স অন ট্যাক্স অর্থাৎ করের ওপর কর (দ্বৈত কর) আরোপ করা হবে মনে করেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন আইনে ভ্যাটের জাল ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে। বর্তমানে ১৯৯১ সালের আইনে নির্দিষ্ট খাতে (৩৯টি) প্রযোজ্য হারে উৎসে ভ্যাট আদায় করা হয়। নতুন আইনে উৎসে ভ্যাট কর্তনের পরিধি ব্যাপক বাড়ানো হচ্ছে। এখন শুধু আমদানি পর্যায়ে বাণিজ্যিক পণ্যে (কমার্শিয়াল ইমপোর্টার) অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) আদায় করা হয়। নতুন আইনে বাণিজ্যিকসহ সব পণ্যে অগ্রিম ভ্যাট দিতে হবে। ফলে ভ্যাটের আওতা ব্যাপক বাড়বে।

ভ্যাট বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইনে যে রেটগুলো নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে দেখা যায়, মোট কর-ভার পণ্য ও সেবার মূল্যে গড়ে ২৭ শতাংশ থেকে সাড়ে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে, যা বর্তমানে রয়েছে ২০ শতাংশ। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে ভ্যাট আহরণের ক্ষেত্রে করের ওপর কর বা দ্বৈত কর ব্যবস্থা চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। তবে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এরই মধ্যে বলেছেন, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে না।

 

"