ফেভারিট তকমার মান রাখল ভারত

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০

সাহিদ রহমান অরিন

দুর্বার গতিতে ছুটছিল অস্ট্রেলিয়া। টানা ৮ ম্যাচ জিতে বুক ফুলিয়ে বিশ্বকাপের দেশে পা রেখেছিল অজিরা। সঙ্গে স্টিভেন স্মিথ-ডেভিড ওয়ার্নারের প্রত্যাবর্তন দলের আত্মবিশ্বাসকে গগনে চুম্বন করার সুযোগ করে দিয়েছিল। যেন পাদুকা জোড়ার সঙ্গে পাখা লাগিয়ে উড়তে শুরু করেছিল অজিরা। তাতে সাবেকদের মনেও বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছিল, বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশন সফলভাবেই সমাপ্ত করবে উত্তরসূরিরা। সোনালি ট্রফিতে ষষ্ঠবার নিজেদের নাম খোদাই করে রাখার অভিযানটা প্রত্যাশানুযায়ী শুরুও করেছিল অ্যারোন ফিঞ্চ বাহিনী। তবে সেই প্রত্যাশার পারদ অবশেষে খানিকটা নেমে গেল। উড়তে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে শেষ পর্যন্ত মাটিতে নামাল ভারত। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে কোহলি বাহিনী বুঝিয়ে দিল, স্বাগতিক ইংল্যান্ডের পরেই ‘হট ফেভারিট’ তকমাটা তাদের পিঠে এমনি এমনি জুড়ে দেওয়া হয়নি। কাল ভারতের কাছে ৩৬ রানে পরাজয় বরণ করেছে অজিরা। কুড়ি বছর পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ব্যর্থ হলো ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফলতম দলটি।

লন্ডনের দ্য ওভালে ভারতের ছুড়ে দেওয়া ৩৫৩ রানের ইমারত টপকাতে হলে বিশ্বকাপে রান তাড়ার রেকর্ড গড়তে হতো অস্ট্রেলিয়াকে। সেটা করতে হলে প্রথম থেকেই দ্রুতগতিতে রান তুলতে হতো তাদের। কিন্তু বুমরাহ-ভুবনেশ্বরদের বিপক্ষে ‘ধীরে চলো’ নীতিতে এগোতে থাকেন অধিনায়ক ফিঞ্চ ও সঙ্গী ওয়ার্নার। ফিঞ্চ ১০০ স্ট্রাইক রেটে রান তুললেও (৩৫ বলে ৩৬) এদিন ‘স্বভাববিরোধী’ ব্যাটিং করেন ওয়ার্নার (৮৪ বলে ৫৬)। মারকুটে ওয়ার্নারের ধীরগতির ব্যাটিংই শেষে কিনা কাল হয়ে দাঁড়ায়! যার ফলে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (১৪ বলে ২৮), অ্যালেক্স ক্যারিরা (৩৫ বলে ৫৫*) শেষ দিকে ঝড়ের বেগে রান তুললেও সেটা কেবল পরাজয়ের ব্যবধানটাই কমাতে পেরেছে। মাঝে স্টিভেন স্মিথ (৬৯) ও উসমান খাজা (৪২) অস্ট্রেলিয়াকে কক্ষপথে রাখার চেষ্টা করলেও ফিনিশার হয়ে উঠতে পারেননি।

ভারতের পক্ষে ৩টি করে উইকেট নিয়েছেন ‘পেস টুইন’ বুমরাহ ও ভুবনেশ্বর। চাহাল ঝুলিতে পুরেছেন ২টি উইকেট। অজিরা বাকি দুই খুইয়েছে রান আউটে কাটা পড়ে, যার শুরুটা ছিল দলপতি ফিঞ্চকে দিয়ে।

এর আগে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন বিরাট কোহলি। আগের ম্যাচের উইনিং কম্বিনেশন ভাঙেননি ভারতের সর্বাধিনায়ক। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে যে দল খেলেছিল, সেই দলই ধরে রেখেছে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। অজিরাও হেঁটেছে ভারতের পথে। তারাও খেলতে নামে অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে।

ভারত ব্যাটিংয়ে নামলে বোধহয় খানিকটা চিন্তায় পড়ে যান ১৩০ কোটি ভারতীয়। কারণ অনেক দিন হলো হাসছিল না ওপেনার শিখর ধাওয়ানের ব্যাট। তার ওপর মিচেল স্টার্ক-প্যাট কামিন্স-অ্যাডাম জ্যাম্পা সমৃদ্ধ অজি বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে ধাওয়ানের ফর্মে ফেরা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা যেন বেড়েই চলেছিল ভারতীয় ক্রিকেট অনুরাগীদের। তবে ভক্তদের আশ্বস্ত করে বাঁ-হাতি ওপেনার জানান দিয়েছেন, ফিরে আসার মঞ্চ হিসেবে বড় ব্যাটসম্যানরা সব সময় বড় মঞ্চকেই বেছে নেন।

বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে কাল অজি বোলারদের শাসন করে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সপ্তদশ ও ক্রিকেটের বৃহত্তম আসরের তৃতীয় শতরানটি তুলে নিয়েছেন ‘গব্বর’। তাতে রানের ইমারত গড়েছে ভারত, ৫ উইকেট হারিয়ে ৩৫২ রান! ম্যাচ শেষে মনোমুগ্ধকর ব্যাটিংয়ের পুরস্কারটা পেয়েছেন ধাওয়ানই। ম্যাচ সেরা হয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান।

চলতি বিশ্বকাপটা সেঞ্চুরি দিয়ে শুরু করেছিলেন ধাওয়ানের উদ্বোধনী সঙ্গী রোহিত শর্মা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কাল আরেকটা শতক ছোঁয়া না হলেও ‘হিটম্যান’ খেলেছেন ৫৭ রানের কার্যকরী ইনিংস। তিনি ও ধাওয়ান ওপেনিং জুটিতে ১২৭ রানের জুটি গড়েন। রোহিতকে ফেরান নাথান কুল্টার নাইল। ‘মুম্বাইকর’ ফেরার পরে ভারতের ইনিংসের হাল ধরেন ধাওয়ান ও অধিনায়ক বিরাট কোহলি। আগের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকান বিপক্ষে ব্যর্থ হলেও এদিন স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছোটান দুই ‘দিল্লি বয়’।

বিগ ম্যাচে কোহালিকে ভারমুক্ত রাখেন ধাওয়ান। ৯৬ বলে পূর্ণ করে শতক। ১১৭ রান করে স্টার্কের শিকারে পরিণত হওয়ার আগে কোহলির সঙ্গে গড়ে তোলেন ৯৩ রানের আরেকটি কার্যকরী জুটি। শিখর যখন ফেরেন তখন ভারতের রান ২ উইকেটে ২২০। শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে দ্রুতগতিতে রান তোলার জন্য ধোনির আগে হার্দিক পান্ডিয়াকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় টিম ম্যানেজমেন্ট। হার্দিকও ম্যানেজমেন্টের মর্যাদার প্রতি সুবিচার করেন। ২৭ বলে ৪৮ রানের ঝড়ো ইনিংস উপহার দেন তিনি। হার্দিক বিদায় নিলে ধোনিও কালক্ষেপণ না করে স্কোর বোর্ডে জমা করেন ১৪ বলে ২৭ রান। শেষ দিকে একটি করে চার ও ছক্কায় লোকেশ রাহুলের ৩ বলে ১১ রানের ক্যামিওতে সাড়ে তিনশর গণ্ডি পেরোয় ভারত। ৮২ রান করে ইনিংসের শেষ ওভারে আউট হন ‘কিং কোহলি’। মাঠ ছাড়ার সময় ভারত অধিনায়কের মুচকি হাসিই বলে দিচ্ছিল, সাড়ে তিনশ রান শুধু অস্ট্রেলিয়া কেন, বুমরাহ-ভুবনেশ্বরদের নিকট যেকোনো দলকে এর কমে বেঁধে ফেলার জন্য যথেষ্ট!

 

সংক্ষিপ্ত স্কোর

 

ভারত : ৩৫২/৫, ৫০.০ ওভার

ধাওয়ান ১১৭, কোহলি ৮২, রোহিত ৫৭, হার্দিক ৪৮

স্টয়নিস ৬২/২, কামিন্স ৫৫/১, কুল্টার নাইল ৬৩/১

 

অস্ট্রেলিয়া : ৩১৬ অল আউট, ৫০.০ ওভার

স্মিথ ৬৯, ওয়ার্নার ৫৬, ক্যারি ৫৫*, খাজা ৪২

ভুবনেশ্বর ৫০/৩, বুমরাহ ৬১/৩, চাহাল ৬২/২

 

ফল : ভারত ৩৬ রানে জয়ী

ম্যাচসেরা : শিখর ধাওয়ান (ভারত)

 

"