মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় না : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ | ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে কাজ চলছে। মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়েছে। কিন্তু সাড়া পাইনি। সমস্যাটা হচ্ছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়। তবে সবাই মিলে বললে হয়তো সাড়া পাব। তাই রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্ট সংকটের বিষয়টি ওআইসি সম্মেলনে তুলে ধরেছি। গতকাল রোববার বিকেল ৫টায় তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ডে ১২ দিনের সরকারি সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন। প্রধানমন্ত্রী তার ত্রিদেশীয় সফরকে সফল ও ফলপ্রসূ বলে অভিহিত করেন। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

তিনি জানান, ওআইসি সম্মেলেন তিনি মুসলিম দেশগুলোতে সহিংসতা, রক্তপাতের অবসানে ওআইসিকে আরো উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, এই যে আমরা আত্মঘাতী সংঘাত করে যাচ্ছি, একে অপরকে খুন করছি, রণক্ষেত্র হচ্ছে মুসলিম বিশ্ব। প্রতিটা মুসলিম দেশের মধ্যেই খুনোখুনি হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে যারা অস্ত্র তৈরি করছে এবং বিক্রি করছে। আর মুসলমান মুসলমানের রক্ত নিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিয়ে এসেছি।

তিনি বলেন, ওআইসিতে অনেক কথা বলে এসেছি। আমাদের মধ্যে যদি কোনো দ্বন্দ্ব থাকে, তা আমাদের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা দরকার।

তিনি বলেন, আমি ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশে ওআইসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইসলামী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘উৎকর্ষ কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছি। পাশাপাশি ওআইসির মধ্যকার আন্তঃবাণিজ্য, বিনিয়োগ, সবুজ ও নীল অর্থনীতির উন্নয়ন, মুসলিম উম্মাহর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে মধ্যপন্থার চর্চা ইত্যাদিতে ওআইসির প্রচেষ্টা ও উদ্যোগসমূহে বাংলাদেশের সমর্থনের কথাও তুলে ধরেছি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি বিশ্বাস করি ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশের গৃহীত উদ্যোগ, অভিজ্ঞতা ও অর্জনগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাখাইনে তো এখনো মানুষ আছে। আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রতিনিধিদল সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে এসেছেন। সবকিছু যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন দেখা গেল রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চায় না। তারা ফিরে না যাওয়ার দাবিতে আন্দোলন করল। কিন্তু এই আন্দোলনের উসকানিটা কারা দিল?

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো চায় না রোহিঙ্গারা ফিরে যাকÑ এমন অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে বিদেশ থেকে তাদের কাছে সাহায্য আসা বন্ধ হয়ে যাবে।

চীন রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখবে কি নাÑ এ প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যাবে। রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিয়ে আমরা ভারতের সঙ্গে কথা বলছি, জাপানের সঙ্গে কথা বলছি, অন্যদের সঙ্গেও কথা বলছিÑ তারা সবাই বলছে, তারা মিয়ানমারের নাগরিক, তাদের ফিরে যাওয়া উচিত। জুলাইয়ে চীনে সফর হতে পারে। সে সময় এ বিষয়ে আলোচনা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জয় ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চান, গত বছর শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় মোদি বলেছিলেন, তিস্তায় সুবাতাস বইবে। নতুন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই ইস্যুর কী হবে জানতে চান ওই সাংবাদিক।

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মেরিটাইম বাউন্ডারির মতো কঠিন সমস্যার সমাধান করেছি। ছিটমহল বিনিময় করেছি। অথচ এ নিয়ে পৃথিবীর বহু দেশে যুদ্ধ বেধে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে এসবের সমাধান করেছি। পানির জন্য কারো মুখাপেক্ষী থাকতে হবে না, ডেল্টা প্ল্যান করেছি। তাই তিস্তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তার দরকার নেই।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক শেখ হাসিনার ফিনল্যান্ড সফরে দেশের ওপর হুমকি নিয়ে করা এক মন্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হুমকি সব সময় আসে, অনেক হুমকি। সব বলে মানুষকে ভীত করতে চাই না। আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে সব তথ্য আছে। আপনারা জানেন যে নানা নামে নানাভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নানা থ্রেট কিন্তু দিতেই থাকে। এবার ঈদের আগেও তেমন হুমকি ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঈদের জামাতের সময় আমি সত্যিই খুব চিন্তিত ছিলাম। কারণ এমন এমন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তা যেন কোনোমতে না ঘটে। এবার কিন্তু কেউ কিছু করতে পারেনি। জঙ্গিবাদ দমনে জনগণের সচেতনতাকে ‘সবচেয়ে বড় শক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জনগণ কিন্তু যথেষ্টা সচেতন। আমরা জনগণকে সম্পৃক্ত করেই এ ধরনের হুমকি মোকাবিলা করতে চাই। সে জন্য জনগণের কাছে সব সময় আমার আবেদন থাকবে, তারা যেন এ ব্যাপারে সজাগ থাকেন, সচেতন থাকেন। কারণ এসব ঘটনা আমাদের উন্নয়নের গতি ব্যাহত করবে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, কোথাও কোনো তথ্য পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

সংবাদ সম্মেলনে লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে প্রশ্নে শেখ হাসিনা একুশে আগস্ট হত্যা মামলার প্রসঙ্গ আনেন। ওই মামলায় ঘোষিত রায়ে তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন আদালত।

তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই নাম নিতেও ঘৃণা লাগে। তবে আজ হোক কাল হোক, এক দিন তার শাস্তি কার্যকর হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাকে ফিনল্যান্ড থেকে আনতে যাওয়ার বিমানের উড়োজাহাজের পাইলটের পাসপোর্ট ছেড়ে কাতার যাওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা ইমিগ্রেশনের দুর্বলতা। দিনে দিনে ভিআইপি ও ভিভিআইপির সংখ্যা বাড়ছে। আরো যত ‘ভি’ লাগুক না কেন কাউকে ছাড়া হবে না।

আসছে বাজেটে সামাজিক কল্যাণ খাতে সরকারের অগ্রাধিকার কী হবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাংলাদেশে বিশাল। প্রতিবন্ধী, বিধবা, অসহায় দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য সরকার নানা কর্মসূচি নিয়েছে। এসব অব্যাহত থাকবে। উন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যা কম। তারা অনেক কিছু পারে। অনেক সম্পদ তাদের। কিন্তু আমাদের মতো সম্পদ ও বিপুল জনসংখ্যা থাকলে কী হতো সেটাই প্রশ্ন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই তিন দেশ সফর নিয়ে লিখিত বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরম্পরা তুলে ধরেন। বলেন, স্বাধীনতার সময় এবং পরে আমাদের সহায়তা করেছে জাপান। এবারের সফরে আড়াই শ কোটি ডলারের চুক্তির কথা উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর দুই পাশে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও ছিলেন।

 

 

"