মাদকের অপব্যবহার বন্ধে তৎপরতা : কঠোর সরকার

মামলায় জামিন কম জনবল সংকট প্রকট

প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

দেশজুড়ে বাড়ছে মাদকের অপব্যবহার। সর্বত্রই মাদকের কালো থাবা। উঠতি বয়সী তরুণ-তরণী ও যুব-সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে মাদকের মরণ নেশা। এই পরিস্থিতি ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে সরকার। জিরো টলারেন্স নীতিতে গ্রহণ করা হচ্ছে নানামুখী তৎপরতা। বাড়ানো হয়েছে মাদকদ্রব্য অধিদফতরের কাজের ক্ষেত্র। চলছে মাদকবিরোধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান।

মাদকের বিরুদ্ধে চলা অভিযানে প্রতিনিয়তই উদ্ধার হচ্ছে বিপুল পরিমাণ নেশা জাতীয় দ্রব্যদি; যার মধ্যে বেশি জব্দ হয়েছে নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ইয়াবা, ফেনসিডিল ও ক্ষতিকর ইনজেকটিং এ্যাম্পুল। এছাড়া গাঁজা, হেরোইন ও চোলাই মদের পরিমাণও কম নয়। কিন্তু অধিদফতরের জনবল সংকটে কিছুটা ভাটা পড়ার সুযোগে মাদক চোরা কারবারিরা নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য অধিদফতরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত সাত বছরে মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়েছে ৪৬ হাজার ২৫২ জন; যাদের মধ্যে জামিন পেয়েছেন মাত্র ৫ জন। তবে মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচাররোধে নানামুখী পদক্ষেপ কর্মসূচি তারা হাতে নিয়েছে। লক্ষ্য মাদকবিরোধী গণসচেতনতা সৃষ্টি এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনবার্সন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দেশে মাদকের অপব্যবহার কমিয়ে আনা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে মাদকদ্রব্য অধিদফতর থেকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাদকের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। মাদক আইনে মাদকের পৃষ্টপোষকতাকেও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু মাদকের ব্যবহার কমছে না। দেখা গেছে, ২০১৩ সালে মাদকের বিরুদ্ধে এক অভিযানে উদ্ধার হয় ১০.৬২ কেজি হেরোইন। ২০১৮ সালে অভিযানে উদ্ধার হওয়া হেরোইনের পরিমাণ তিন কেজি বেড়েছে অর্থাৎ ১৩.৩০ কেজি। উদ্ধারের চিত্র বলছে, মাদকের ব্যবহার কমেনি বরং বেড়েছে। একইভাবে ২০১৪ সালে ৯.৫১ কেজি, ২০১৫ সালে ১১.৩০ কেজি, ২০১৬ সালে ৮.৪৭ কেজি এবং ২০১৭ সালে ১৯.৪০ কেজি হেরোইন উদ্ধার হয়েছে।

২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় ২৪ গুণ বেশি ইয়াবার ব্যবহার বেড়েছে অর্থাৎ ওই সময়ে উদ্ধার হয় ইয়াবার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬টি এবং ৬ বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৩ হাজার ৯৮৩টি। এছাড়া ২০১৩-২০১৮ সাল পর্যন্ত গত ছয় বছরে উদ্ধার হয়েছে গাঁজা প্রায় ৭৩ কেজি, ফেনসিডিল (কোডিন) ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৪ বোতল, চোলাই মদ ৯৭ হাজার ৪৫৭ লিটার, গাঁজা ২২৬০৮ কেজি, ইনজেকটিং ১ লাখ ৩২ হাজার ৯১৫টি এবং ইয়াবা ৯১ লাখ পিচ।

এদিকে, মাদকের ব্যবহার সহনীয় পর্যায়ে আনতে মাদকদ্রব্য অধিদফতরের অপারেশনাল কার্যক্রমে ২০১৩-২০১৮ সাল পর্যন্ত ৭১৫৬০টি মামলা রুজু হলেও আসামি করা হয় ৭৩ হাজার ১১২ জনকে। সবচেয়ে বেশি মামলা ও আসামি করা হয়েছে ২০১৮ সালে যথাক্রমে ১৭৭৯৩টি ও ১৫১১৬ জনকে।

একইভাবে মোবাইল কোর্টের হিসাবে অন্য আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২-২০১৮ সাল পর্যন্ত গত সাত বছরে মামলা ও গ্রেফতার হয়েছে যথাক্রমে ৪৪৭৪৭টি এবং ৪৬২৫২ জন; যাদের সবাই সাজাপ্রাপ্ত। এসব আসামির মধ্যে জামিন হয়েছে মাত্র পাঁচজনের। জামিনে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী জামিনে মুক্ত হওয়ার সংখ্যা কমে গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত জনবল দিয়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার আয়তনের বাংলাদেশের চারপাশের সীমান্ত পাহারা বসানো কঠিন ও চ্যালেঞ্জের। জানা গেছে, অধিদফতরের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে ১১৭৬ জন; যথাক্রমে ১০৫ জন, ১৪১ জন, ৬১৪ জন ও ৩১৬ জন। তবে প্রায় অর্ধেক পদশূন্য যার মধ্যে প্রথম শ্রেণির ৫৪টি, ২য় শ্রেণির ৩১টি, ৩য় শ্রেণির ৪২৪টি ও চতুর্থ শ্রেণির শূন্যপদ ২৮টি অর্থাৎ ৫৩৭টি পদই শূন্য। তবে মাদকের কার্যক্রমে গতি ফেরাতে সরকার বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো ১৭১৩ জন থেকে বাড়িয়ে জনবল অনুমোদন দিয়েছে ৩২২২ জন যা সচিব কমিটির সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে, মাদকের চাহিদা, সরবরাহ ও ক্ষতি কমাতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এসব উদ্যোগের মধ্যে গণসচেতনতা ও সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ; নিরোধ শিক্ষা গতিশীল করা, অবৈধ মাদক পাচার প্রতিরোধ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে মতবিনিময় করা; মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা; মাদক পাচারের রুট, স্পষ্ট চিহ্নিত করা ও মাদক পাচারকারী, মাদক ব্যবসায়ী, মাদক পরিবহনকারী ও মাদক মজুদকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা।

 

"