বিশ্বে সবচেয়ে বেশি জনমতের নেতা মোদি

বিরোধী দলের মর্যাদা পায়নি কংগ্রেস, পদত্যাগ করতে পারেন রাহুল

প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

৩০ মে দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। আর তার আগেই গড়ে ফেলেছেন আরেক বিশ্বরেকর্ড। পৃথিবীর মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি জনমতের ভিত্তিতে ক্ষমতায় আসা নেতা হলেন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৪-তে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন যে, মোদির কাছেই উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষের সমর্থন রয়েছে। ২০১৯-এ এই সংখ্যাটা আরো বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড লিডারদের মধ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এত কঠিন লড়াইয়ে এ রকম বিপুলভাবে জিতে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদিই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক। মোদির বন্ধু বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইসরায়েলের কঠিন লড়াইয়ে জিতেছেন ঠিকই, তবে তিনি ছোট আঞ্চলিক দলগুলোর সাহায্যে মাত্র ৬৫ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পঞ্চমবারের জন্য ক্ষমতায় আসার রেকর্ড গড়েছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে ভালো জায়গায় থাকলেও নরেন্দ্র মোদির তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আরো একজন বড় মাপের রাষ্ট্রনায়ক ইন্দোনেশিয়ার, জোকো উইডোহো। তিনি সম্প্রতি বিপুলভাবে জিতে ক্ষমতায় এসেছেন। থেরেসা মে পদত্যাগ করলেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল পায়ের তলার মাটি বাঁচাতে লড়ছেন। তুরস্কের রিসেপ এরদোগান এবং রাশিয়ার পুতিনও খুব একটা ভালো জায়গায় নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও খুব একটা বড় ব্যবধানে জিতে ক্ষমতায় আসেননি। পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকলেও শি জিনপিংয়ের কাছে অবশ্য বড় সংখ্যক মানুষের সমর্থন রয়েছে। আগামী কয়েক মাসে এসসিও, জি২০, জি৭ বৈঠক আছে। সেখানে নিজের বক্তব্য এবার আরো জোর গলায় তুলে ধরতে পারবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

গত পাঁচ বছরে বারবার অভিযোগ উঠেছে, নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটি দলের প্রবীণ নেতাদের সম্মান তো দেননি, উল্টো গুরুত্বহীন করে দিয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর জোশির মতো নেতারা, যাদের দলের কোনো পদে না রেখে, পরামর্শদাতা বা মার্গদর্শক মন্ডলীর সদস্য করে রাখা হয়েছিল। দলের প্রার্থীও করা হয়নি। এই অবস্থায় গতকাল শুক্রবার সকালে, বিরাট জয়ের নিজের প্রথম গন্তব্য হিসেবে বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি এবং মুরলি মনোহর জোশি বাসভবনকেই বেছে নিয়েছেন ভারতের হবু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই দুই নেতার সঙ্গে সাতসকালেই বৈঠক করে নিজের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।

গুজরাটের গান্ধীনগর কেন্দ্রের ছয়বারের সংসদ সংসদ লালকৃষ্ণ আদভানির জায়গায় প্রার্থী হয়েছিলেন দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। কিন্তু যে পথে এগোচ্ছে তার প্রতিষ্ঠা করা ভারতীয় জনতা পার্টি, তা নিয়ে যে খুশি ছিলেন না আদভানি, তা নিজের ব্লগে লিখে জানিয়েছিলেন তিনি নিজেই। অন্যদিকে কানপুরে থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া নিয়েও নিজের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এনেছিলেন মুরলি মনোহর জোশি। আদভানির বাড়িতে গিয়ে তার আশীর্বাদ নিয়ে, পরে নিজেই সেই ছবি টুইট করে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বিজেপির আজকের সাফল্য সম্ভব হয়েছে তার মতো মহান ব্যক্তিদের অবদানের জন্যই। দশকের পর দশক ধরে পরিশ্রম করে তারা এই দল তৈরি করেছেন।

বিপুল ভোটে জয়ের জন্য সারা দেশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। শুভেচ্ছা বার্তা আসছে দেশের বাইরে থেকেও। শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেননি বি-টাউনের তারকারাও। জয়ের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ। তবে শুভেচ্ছা জানানোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর কোনো এক অনুরাগী, তার মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে কী করা উচিত? প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছেন অনুরাগ। সঙ্গে তার মেয়ে ধর্ষণে হুমকি দেওয়া, সেই টুইটে প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগও করেছেন পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ। যেখানে দেখা যাচ্ছে, চৌকিদার রামসংঘী বলে কোনো এক টুইটার হ্যান্ডেল থেকে অনুরাগের মেয়ে আলিয়ার উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে, বাবাকে বলো মুখ বন্ধ রাখতে, না হলে... যদিও এক্ষেত্রে সিনেমার নির্দেশক অশোক পন্ডিত পাল্টা টুইট করে লিখেছেন, এই টুইটার হ্যান্ডেলটি (চৌকিদার রামসংঘী) ফটোশপ করে তৈরি বলেই মনে হয়। সারা দেশ যখন মোদির জয়ে খুশি তখন কোনো এক আরবান নকশাল এই টুইটটি ফটোশপ করে বানিয়েছেন বলেই মনে হয়।

অন্যদিকে ৩৪ থেকে নেমে ২২, লোকসভা ভোটের ফল পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। সেই ধাক্কায় পরের দিন বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও এক দিন পিছিয়ে শনিবার, ২৫ মে দলের পর্যালোচনা বৈঠক ডেকেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জয়ী এবং পরাজিত প্রার্থীদের পাশাপাশি জেলা সভাপতি, জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক এবং বর্ষীয়ান নেতানেত্রীদের বৈঠকে থাকতে বলা হয়েছে। তৃণমূল সূত্রে খবর, কেন এত বড় ধাক্কার মুখে পড়তে হলো দলকে, সেই পর্যালোচনা ঘিরে বৈঠক উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা। দলের এক সূত্রের দাবি, মমতার কালীঘাটের বাড়িতে ওই বৈঠকে প্রার্থীদের হারের কারণ ব্যাখ্যা করতে হতে পারে মমতার কাছে। বস্তুত, রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে যত নির্বাচন হয়েছে, প্রতিটি নির্বাচনের পরের দিনই দলনেত্রী বৈঠক ডাকেন। কিন্তু সেই সব নির্বাচনে বিপুল সাফল্য পেয়েছে তৃণমূল। ফলে সেই বৈঠক কার্যত দলনেত্রীর পিঠ চাপড়ানোর বৈঠক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাংগঠনিক কিছু নির্দেশ, জয়ীদের পিঠ চাপড়ানো ছিল বৈঠকগুলোর উপজীব্য। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আসন কমার পাশাপাশি বিজেপির বিপুল উত্থান, লোকসভা ভোটের ফলের নিরিখে ১৩৬টি বিধানসভায় হেরে গেছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভার উপনির্বাচনেও, আটটির মধ্যে মাত্র তিনটিতে জয়। বিজেপি জিতেছে চারটিতে, একটিতে কংগ্রেস। সব মিলিয়ে অশনিসংকেত বলেই মনে করছেন তৃণমূল দলের নেতানেত্রীরা। এই অবস্থায় কোন আসনে কেমন ফল হলোÑ কেন এত আসনে হারতে হলো, সমস্যা কোথায় ছিলÑ দলনেত্রীর কাছে তার জবাবদিহি করতে হবে সংগঠনের দায়িত্বে থাকা নেতাদের। তৃণমূলের খবর, দলনেত্রীর সামনেই ওঠে আসতে পারে একাধিক জেলায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বিষয়টিও।

এরই মধ্যে, দলের শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগে শুভ্রাংশু রায়কে সাসপেন্ড করেছে, তৃণমূল কংগ্রেস। লোকসভা ভোটে রাজ্যে ধাক্কা খাওয়ার পর প্রথম কোপ পড়েছে এক সময়ের মমতার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মুকুল রায়ের (এখন বিজেপি-র বারো নেতা) ছেলের ওপরে। তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, দলে থেকেও দলবিরোধী মন্তব্য করেছেন শুভ্রাংশু রায়। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দলের শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি। শুভ্রাংশুকে ছয় বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাতে অনুমোদন দিয়েছে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক শুভ্রাংশু রায় বলেছেন, আমি যেমন এখানকার ভূমিপুত্র, তেমনি আমার বাবা মুকুল রায়ও। বাবার কাছে হেরে গিয়েছি। মানুষ বেছে নিয়েছে বাবাকে। আমার বাবা এক হাতে গোটা তৃণমূলকে তছনছ করে দিয়েছেন। শুভ্রাংশুর এ মন্তব্যের পরই তাকে সাসপেন্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে খবর।

আর সবচেয়ে খারাপ খবর এখন কংগ্রেসের। আইনসভার সদস্য সংখ্যা যত, তার ১০ শতাংশের বেশি আসন জিতলে তবে অর্জন করা যায় ভারতের বিরোধী দলের যোগ্যতা। এবার ভারতজুড়ে মোদি সুনামির জেরে সেই যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ কংগ্রেস। তবে এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৪ সালেও লোকসভায় প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা হারিয়েছিল রাহুল গান্ধীর দল। ফলে পর পর দুবারই সাধারণ বিরোধী দল হয়েই পাঁচ বছর লোকসভায় থাকতে হবে কংগ্রেসকে। ২৬ জানুয়ারি ১৯৫২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত লোকসভা ১১ জন বিরোধী দল নেতা পেয়েছে। এর মধ্যে কংগ্রেস ছয়বার বিরোধী আসনে বসেছে। এর মধ্যে পাঁচবার কংগ্রেস প্রধান বিরোধীদের মর্যাদা পেয়েছিল। ২০১৪ সালে প্রথমবার কংগ্রেস প্রধান বিরোধীদের যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। এবারও তাই হয়েছে। ২০১৪ সালে ৪৪টি আসন পেয়েছিল কংগ্রেস। এবার অবশ্য আটটি আসন বেড়েছে কংগ্রেসের। রাহুল গান্ধীর দল এবার ৫২ জন সংসদ সদস্য নিয়ে লোকসভায় যাচ্ছে। কিন্তু লোকসভায় প্রধান বিরোধী দলের যোগ্যতা অর্জনে প্রয়োজন ছিল ৫৪টি আসনের। কারণ লোকসভার মোট আসন ৫৪৩। সেই হিসেবে লোকসভার ১০ শতাংশ আসন ৫৪। সেই সংখ্যা থেকে দুটি আসন কম পেয়েছে কংগ্রেস। একই সঙ্গে এবার লোকসভায় নতুন নেতা কে হবেন, সেটাও খুঁজতে হবে কংগ্রেসকে। ২০১৪ সালে কংগ্রেসের লোকসভার নেতা ছিলেন মল্লিকার্জুন খাড়গে। এবার তিনিও হেরেছেন। কোনো রকমে মুখরক্ষা করেছেন রাহুল গান্ধী। তাই এবার লোকসভায় দলের মানরক্ষায় রাহুল গান্ধীই দায়িত্ব নেবেন কিনা তা এখন কয়েকশ’ কোটি টাকার প্রশ্ন!

 

"