ত্রাণের আশা

রোহিঙ্গা শিবিরে বাড়ছে জন্মহার

প্রকাশ | ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০

উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

বাংলাদেশের আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ৩০টি ক্যাম্পে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ শিশুর জন্ম হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে ২০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী সন্তানসম্ভবা। ফলে আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে। তবে এই জরিপ নিয়ে সরকারি সংস্থার মতবিরোধ থাকলেও স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন মহলের মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া নিবন্ধনভুক্ত ৪ লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে ১ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে যে ৭ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে এদের মধ্যেও ২ লাখ ৪০ হাজার শিশু-কিশোর রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যাবাসনকাল দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশু ও এখানে বড় হওয়া শিশু-কিশোরদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।

‘পরিকল্পিত উখিয়া চাই’ সংগঠনের আহ্বায়ক, সাংবাদিক নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেছেন, কিছু এনজিও সংস্থা রোহিঙ্গা মায়েদের সন্তান প্রসবে উৎসাহিত করছে। তারা মনে করছে, সন্তান হলেই তার জন্য আলাদা ভরণপোষণ পাওয়া যাবে। তাই ত্রাণের আশায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশু জন্মের সংখ্যা বাড়াতে উৎসাহিত করছেন তারা। সরকারের জন্ম নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি তারা মানছেন না। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের জন্মসূত্রে বাংলাদেশি বলা যাবে না। আর সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। বিষয়টি সরকারের রোহিঙ্গাবিষয়ক নীতির ওপর নির্ভর করছে।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত দিক-নির্দেশনা দেওয়া উচিত। প্রাপ্তবয়স্কদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে, সেভাবে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও নিবন্ধন করা হবে কিনা সে বিষয়ে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ দেশে জন্ম নেওয়া এসব শিশুরাও স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিক বলে বিবেচিত হবে। তারা এ দেশে জন্ম নেওয়ার কারণে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হবে না। কারণ তারা এখানে অস্থায়ীভাবে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে আটকেপড়া বিহারিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আগপর্যন্ত তাদের বিহারি হিসেবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই।

তারা আরো বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনায় যেসব শিশু বাবা-মা ছাড়া আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে এসেছে, তাদের কে গ্রহণ করবে, এসব বিষয়ও আলোচনায় সুষ্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। এই শিশুদের রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবেই দেখা হবে। তিনি বলেন, যেসব শিশু বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে, তাদের তালিকা তৈরি করা উচিত। এসব শিশুর জন্ম তারিখ, ব্লাড গ্রুপ চেক করে রাখাসহ প্রয়োজনে তথ্য থাকা উচিত।

উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান (বর্তমানে ছুটিতে) বলেন, একটি ক্রাইটেরিয়া ছিল জন্ম নিবন্ধনের সার্টিফিকেটে একটি সিল থাকবে, সেখানে লেখা থাকবে তারা মিয়ানমারের নাগরিক। ওই জন্ম নিবন্ধনের কাজটাও চলছিল শুধু নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের জন্য। কিন্তু এই নিবন্ধিতদের বাইরেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ছিল, যাদের বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। এবার এই রোহিঙ্গা আসার পর থেকে কক্সবাজারের পুরো জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়াটাই বন্ধ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবেই কাজ হবে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো ইনস্ট্রাকশন নেই।

রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) দেওয়া তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ নারী। এদের মধ্যে ১৩ শতাংশ কিশোরী এবং ২১ শতাংশ গর্ভবতী ও প্রসূতি। শিশুদের মধ্যে ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশুর হার ২৩ শতাংশ, ৫ বছরের কম বয়সি শিশুর হার ২১ শতাংশ এবং এক বছরের কম বয়সের শিশুর হার ৭ শতাংশ।

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবদুল মান্নান জানান, রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসে, তখন প্রথম তিন মাসে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৪৮০ জন গর্ভবতী নারীর। তার মধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হয় সাড়ে ৫ হাজার শিশু আর বাকিগুলো হোম ডেলিভারি হয়। এ নিয়ে নতুন করে সার্ভে করা দরকার।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য জানান, ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে পরবর্তী ২০ মাসে নবজাতকের সংখ্যা আমাদের হিসাব মতে লক্ষাধিক হবে না। আমাদের ২ শতাধিক কর্মী সপ্তাহে দুই দিন করে উখিয়া-টেকনাফে কাজ করছে। আমরা এ পর্যন্ত ৭২ হাজার নারীকে ইনজেকশন দিয়েছি, ৭৬ হাজার নারীকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ওষুধ দিয়েছি। এছাড়া তিন বছর মেয়াদি ২ হাজার ৪৯১ জন আর ১০ বছর মেয়াদি ইনজেকশন দিয়েছি ২ হাজার ১০০ জনকে।

ক্যাম্পের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্ত বলেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সদ্য সন্তান প্রসব করবে এমন নারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। তাদের জন্ম নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা না গেলে তা ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী তিন মাসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নারী গর্ভবতী ছিলেন। এর আগে ১৯৬৮ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রিত রয়েছে আরো অন্তত ৪ লাখ রোহিঙ্গা। এরপর গত ২০ মাসে এখানে জন্ম নিয়েছে আরো প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গা শিশু।

 

"