আবার নরেন্দ্র মোদি

দুবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর পথে, বিপাকে মমতা

প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

বুথফেরত সমীক্ষায় ইঙ্গিত ছিল আর সেই জনমতের প্রতিফলন ঘটল গণনাপর্বে। ভারতে ফের সরকার গড়তে চলেছে টিম নরেন্দ্র মোদি। ভারতের ‘চৌকিদার’ আবার নরেন্দ্র মোদি। আর সেই জনমতের প্রতিফলন ঘটল গণনাপর্বে। যে চৌকিদারকে প্রচারপর্বে, কংগ্রেস থেকে তৃণমূল কংগ্রেস নানাভাবে বিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ভোটের ফলে তারা নিজেরাই বিদ্ধ হয়ে গেছেন। দেশের ১২টি রাজ্যের একটাতেও জিততে পারেনি কংগ্রেস। বামেরা ধুয়ে-মুছে সাফ। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিজের রাজ্যেই বিজেপির উত্থান রুখতে ব্যর্থ। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের মুখে মমতার কাঁধের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে মোদি-শাহের জুটি। দুজনেই বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে ২০-২২টিতে জিতবেন তারা। অনেকটা লক্ষ্যপূর্ণ করেও ফেলেছেন। আর ৪২-এ ৪২ সেøাগান তোলা তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যে সহমত নয়, তা স্পষ্ট হয়েছে বৃহস্পতিবারের ভোট গণনাপর্বে।

দেশজুড়ে এবার ফের গেরুয়া ঝড়। আর সেই ঝড়ে বেসামাল হিন্দিবলয় থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা এমনকি উত্তর-পূর্ব ভারত। এককভাবে বিজেপি আগের বারের ২৮২ টপকে গেছে। ৩৪২ আসনে জয়লাভ করেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। জনমতের প্রবণতায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বাড়লেও সরকার গঠনের ধারে কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই ইউপিএ জোটের। চন্দ্রবাবু নাইডু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়বতী-অখিলেশরা যে তৃতীয় ফ্রন্ট বা জোট গড়ার চেষ্টায় ছিলেন, নিজেদের রাজ্যেই শোচনীয় ফল তাদের। পশ্চিমবঙ্গে এক ধাক্কায় অনেকটা আসন বেড়েছে বিজেপির। উত্তর প্রদেশেও বিজেপি ৫০টির কাছাকাছি আসন পেতে পারে বলে ইঙ্গিত। অন্ধ্রে উত্থান হয়েছে ওয়াইএসআরসিপির। সেখানে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তেলেগু দেশম পার্টির সুপ্রিমো চন্দ্রবাবু নাইডু। পদত্যাগের পথে পাশের রাজ্য কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেসের জোটসঙ্গী জনতা দল সেকুলার নেতা এইচ ডি কুমারস্বামী।

সম্ভবত ২৯ তারিখ বুধবার দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন নরেন্দ্র মোদি। দিনটি তিনি বেছে নিয়েছেন জ্যোতিষের পরামর্শ মেনেই। কথায় আছে, মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এবার সত্যি যা খুশি করতে পারবেন। তিন তালাক বিল থেকে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা বিতর্কিত এনআরসি বিল পাসে কোনো বাধা রইল না। এ অবস্থায় রেকর্ড জয়ে এনডিএর ফের ক্ষমতা দখলকে দেশের জয় বলে আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশকে আরো শক্তপোক্ত করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এগজিট পোল আভাস দিয়েছিল, কিন্তু এনডিএ যে এভাবে ফের ক্ষমতায় আসবে, তা বোধহয় প্রত্যাশিত ছিল না অনেকের কাছেই। গণনা যত এগিয়েছে, ততই হাসি চওড়া হয়েছে গেরুয়া শিবিরের। গতবারের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো বটেই, রেকর্ড আসন জিতে ক্ষমতা দখলের পথে নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। সরকার গড়ার ম্যাজিক ফিগার ২৭২, যা বিজেপি একাই পেয়েছে। স্বভাবতই এ জয়কে দেশের জয় বলে আখ্যা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। টুইটে নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, সবকা সাথ + সবকা বিকাশ + সবকা বিশ্বাস = বিজয়ী ভারত। একসঙ্গে আমরা বেড়ে উঠব। একসঙ্গে উন্নতি করব। একসঙ্গে আমরা দৃঢ় ভারত গড়ে তুলব। ভারত ফের জিতল। # বিজয় ভারত।

ওদিকে বিজেপির জয় সুনিশ্চিত হতেই দলের প্রধান কার্যালয়ে যান পার্টি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ। জয়ের পরই অমিত শাহ জানিয়েছেন, এ জয় ভারতের। দাবি করেছেন, বিরোধীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং মিথ্যে প্রচারের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ উচিত জবাব দিয়েছেন। জাত-পাত এবং পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষ তাদের মত জানিয়েছেন। অমিত শাহ বলেছেন, এই ফলই বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি মানুষের কতটা আস্থা রয়েছে। মানুষ জাতীয়তাবাদ এবং উন্নয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এ জয় নবীন প্রজন্মের আশার জয়। দরিদ্র এবং কৃষকদের জয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হয়ে দলের সবস্তরের কর্মীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন অমিত শাহ। বলেছেন, দলীয় কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আজ এই দিন এসেছে।

অন্যদিকে অ-বিজেপি, অ-কংগ্রেসি জোটের কাছে কার্যত তুরুপের তাস ছিল উত্তর প্রদেশ। কারণ আসন সংখ্যার নিরিখে (লোকসভার ৮০টি আসন) দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই রাজ্যে দীর্ঘদিন বাদে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, বহুজন সমাজ পার্টি এবং সমাজবাদী পার্টি একহয়ে ভোটে লড়েছিল। সঙ্গে ছিল অজিত সিংহের আরএলডিও। কিন্তু তাতেও ফল আশানুরূপ নয় বললেই চলে। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির ৭১টি থেকে আসন কমলেও ৫০-এর কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনা। জোটের ঝুলিতে যেতে পারে ২৫টির মতো আসন। বিরোধী মহাজোটের নেতৃত্ব দেওয়া চন্দ্রবাবু নাইডু নিজের রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশেই ধরাশায়ী। রাজ্যের ২৫ আসনের মধ্যে ২০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে জগনমোহন রেড্ডির ওয়াইএসআর কংগ্রেস। প্রতিবেশী রাজ্য তেলেঙ্গানাতেও ভালো ফলের প্রবণতা বিজেপির।

তৃতীয় ফ্রন্ট বা বিরোধী জোটের অগ্রগণ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে ব্যাপক আসন কমছে তৃণমূলের। সেই জায়গায় উঠে আসছে বিজেপি। বিজেপি ১৫ থেকে ১৮টির বেশি আসন পেতে পারে বলে প্রবণতায় ইঙ্গিত। ওড়িশাতেও বিজু জনতা দলকে বিরাট ধাক্কা দিয়ে ব্যাপক ভালো ফলের প্রবণতা বিজেপির। কয়েক মাস আগেই মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়ের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। বিরোধী শিবিরের আশা ছিল, এই তিন রাজ্যে বিজেপির ফল খুব খারাপ হবে। কিন্তু এই তিন রাজ্যে কার্যত ২০১৪ সালের ফলের চেয়ে খুব একটা হেরফের হওয়ার প্রবণতা নেই। বিহারে বিজেপি-জেডিইউ-আরএলএসপির জোট কার্যত বিরোধীদের সাফ করে দেওয়ার পথে। ঝাড়খন্ডেও প্রায় একই অবস্থা। উত্তর-পূর্বে বিজেপির ফল ভালো।

বিজেপি তথা এনডিএর এই বিরাট সাফল্যের কারণ হিসেবে একাধিক বিষয় ওঠে আসছে। অব্জলভিত্তিক গোবলয়ে বিজেপির ভোটবাক্সে ব্যাপক ধসের ইঙ্গিত থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। দ্বিতীয়ত. উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে নিজেদের আসন ধরে রেখেছে বিজেপি এবং তাদের সহযোগী দলগুলো। গোবলয়ে যে সামান্যসংখ্যক আসন কমেছে, সেই ক্ষতি মেরামত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও বিহারের মতো রাজ্যে। দাক্ষিণাত্যে বিজেপি কখনই শক্তিশালী ছিল না। তবু কর্ণাটক, তেলেঙ্গানায় ভালো করতে চলেছে এনডিএ জোট। এসব কিছুর যোগফলেই মুখ থুবড়ে পড়েছে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো। ফলে রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন আপাতত পাঁচ বছরের জন্যে নেই। দক্ষিণের ওয়ানডেতে জিতলেও গান্ধী পরিবারের গড় আমেঠিতে পারলেন না রাহুল। সোনিয়া গান্ধী অবশ্য জিতেছেন রায়বেরেলি থেকে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখা চন্দ্রবাবু, মুখ্যমন্ত্রী পদই খুইয়েছেন। উত্তর প্রদেশের বুয়া-ভাতিজা মায়াবতী-অখিলেশের কিং মেকার হওয়ার স্বপ্নে জল। আর জোটের আরেক নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন নিজের গদি বাঁচাতে ব্যস্ত। এ অবস্থায় গণনা বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইভিএম গণনার পরে ভিভিপ্যাট মিলিয়ে দেখার কাজ শেষ হতে হতে রাত গভীর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। সেই গোটা প্রক্রিয়াটা মেটার আগে পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া তিনি দেবেন না, টুইটারে এই রকম ইঙ্গিত দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টুইটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, জয়ীদের অভিনন্দন। কিন্তু যারা হেরেছেন, তারা সবাই হারেননি। তৃণমূল কংগ্রেসকে একটা পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করতে হবে জানিয়ে মমতা লিখেছেন, তারপর আমরা আমাদের মতামত আপনাদের জানাব। এতেই শেষ করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টুইটের শেষ বাক্যে লিখেছেন, গণনা প্রক্রিয়া শেষ হতে দিন এবং ভিভিপ্যাট মিলিয়ে দেখতে দিন।

তা হলে পশ্চিমবঙ্গের ফল এমন হলো কেন? সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের ভিত্তিতে ভোট হয়েছেÑ এমন অভিযোগ আছে মমতা-বিজেপি উভয়পক্ষের। এ ফলাফল কি বাংলায় তীব্র মেরূকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? বিজেপি নেতৃত্ব বলছে, মেরূকরণ নেই, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরও অনেকে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। তৃণমূলের ধাক্কা খাওয়ার কারণ, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে একজন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে জনসভায় চোর বলছেন! একজন মুখ্যমন্ত্রী, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করছেন। কান ধরে লক্ষ বার ওঠবোস করবেন বলছেন, এমন ঘটনা ভারতে আগে কখনো ঘটেনি। এ ঘটনাকে মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। মানুষ এর বিরোধিতা করছিল। সঙ্গে ছিল মমতার ৮ বছরের শাসনে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া। ভাইপো অভিষেক থেকে দোলে সব স্তরে তোলাবাজি, মাফিয়ারাজ, চিট ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ, বিজেপির তোলা অভিযোগ, রাজ্যের মানুষ সত্যি মেনেছে। ভোটের ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটেছে।

"