১৭ রমজানের বিশেষ গুরুত্ব

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার কৃপায় আমরা পবিত্র মাহে রমজান অতিবাহিত করার সৌভাগ্য পাচ্ছি। আজ ১৭ রমজান। ইসলামে এই ১৭ রমজানের গুরুত্ব অতি ব্যাপক আর এ দিনের প্রেক্ষাপট ইসলামে বিশেষভাবে সংরক্ষিত। কেননা বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল হিজরি দ্বিতীয় সালের ১৭ রমজান আর এ যুদ্ধে আল্লাহতায়ালা তার ফেরেশতা বাহিনী দ্বারা যুদ্ধ করিয়ে বিজয় দান করেছিলেন। বদরের প্রান্তরের যে স্থানটিতে মুসলমানেরা অবস্থান নিয়েছিলেন, সেখানে সূর্যের তেজ সরাসরি তাদের মুখের ওপর পতিত হয়। কিন্তু কাফেরদের মুখে দিনের বেলায় সূর্যের আলো পড়ে না। মুসলমানেরা যেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবেন, সেখানে বালুময় মাটি যা যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত নয়। অপরদিকে কাফেররা যেখানে অবস্থান নিয়েছিল, সেখানে মাটি শক্ত এবং যুদ্ধের জন্য স্থানটি উপযুক্ত। কিন্তু অবস্থান নেওয়ার ফলে অবশেষে কী হলো?

রমজান মাসের ১৬ তারিখ দিনটি শেষ, মাগরিবের পর তারিখ বদলে গেল, অতঃপর ১৭ রমজান শুরু হলো। সেই রাতে উৎকণ্ঠিত মুসলমানেরা এবং উৎকণ্ঠিত কাফেররা নিজ নিজ ক্যাম্পে অবস্থান করছে। সেই রাতে মহান আল্লাহতায়ালার নিকট সিজদায় পড়ে সাহায্য প্রার্থনা করছেন মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)। কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘হে দয়াময় আল্লাহ! আগামীকালের নীতিনির্ধারণী যুদ্ধে তোমার সাহায্য আমাদের অতি প্রয়োজন। এই যুদ্ধে আমরা তোমার সাহায্য ছাড়া বিজয় লাভ করতে পারব না। আর আমরা যদি পরাজিত হই, তোমাকে সিজদা করার কিংবা তোমার নাম ধরে ডাকার লোক এই পৃথিবীতে আর নাও থাকতে পারে। অতঃপর তুমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো কী করবে। কারণ তুমিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মালিক। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যাব। আমরা আমাদের জীবন তোমার পথে উৎসর্গ করলাম। বিনিময়ে তোমার দ্বীনকে আমরা তোমার জমিনে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তুমি আমাদের বিজয় দান করো। আমরা তোমার কাছে সাহায্য চাই’ (যুরকানি, প্রথম খন্ড, পৃ. ৪১৯ ও ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ১৭) মহানবী (সা.) এর দোয়া মহান আল্লাহতায়ালা কবুল করলেন। ওই রাতে মরুভূমিতে প্রবল বৃষ্টি হলো। বৃষ্টি মুসলমানদের উপকারে এলো। কারণ বৃষ্টির কারণে কাফেরদের যুদ্ধের মাঠের শক্ত মাটি কাদায় ভরে পিচ্ছিল হয়ে গেল। অপরদিকে মুসলমানদের যুদ্ধের মাঠ শক্ত হয়ে গেল। ওই রাত্রেই আল্লাহতায়ালা মহানবী (সা.)-কে শুভ সংবাদ দিয়ে বললেন, তোমার অমুক অমুক শত্রু মারা যাবে এবং তারা অমুক অমুক জায়গায় মারা পড়বে। ঠিক তা-ই ঘটল। যখন যুদ্ধের সময় ঘনিয়ে এলো, তখন মহানবী (সা.) যে স্থানে বসে বসে প্রার্থনা করতেন সেই স্থান থেকে বের হয়ে এলেন এবং বললেন, শত্রু সেনাদল পর্যুদস্ত হয়ে যাবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পলায়ন করবে। আল্লাহপাক এমনটিই করেছেন। মহানবী (সা.) এর একনিষ্ঠ এবং প্রাণপ্রিয় সাহাবিরা এ যুদ্ধের আগে এই কসমই খেয়েছিলেন যে, আমরা আপনার ডানে যুদ্ধ করব, আপনার বামে যুদ্ধ করব, আপনার সামনে যুদ্ধ করব, আপনার পেছনে যুদ্ধ করব এবং হে আল্লাহর রাসুল! যে দুশমন আপনার ক্ষতি সাধন করতে এসেছে তারা আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আমাদের লাশের ওপর দিয়ে যাবে। হে আল্লাহর রাসুল! যুদ্ধ তো একটা মামলি ব্যাপার। এখান থেকে কিছু দূরেই সমুদ্র, আপনি যদি হুকুম দেন যে, তোমরা তোমাদের ঘোড়া নিয়ে সেই সমুদ্রে ঝাঁপ দাও, তাহলে আমরা তৎক্ষণাৎ ঘোড়াসহ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব’ (ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ১২)। আসলে এ যুদ্ধে আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের সাহায্য করেছিলেন তার ফেরেশতা বাহিনী দ্বারা। বোখারি শরিফের হাদিস মোতাবেক, যুদ্ধের শেষে সাহাবিদের মধ্য থেকে কেউ কেউ সাক্ষী দিয়েছেন, আমরা সাদা পোশাক পরিহিত কিছু ব্যক্তিকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে দেখেছি। তাদের আমরা যুদ্ধের আগে কখনো দেখিনি, এমনকি যুদ্ধের পরও দেখিনি।

শেষে এটাই বলব, মহানবী (সা.) এর দোয়ার বরকতেই এ যুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন। আমরা কি পারি না, পুনরায় আল্লাহপাকের দরবারে বিনয়ের সঙ্গে এই দোয়া করতে যে, হে আল্লাহ! সমগ্র বিশ্বে ধর্মের নামে যে অরাজকতা ও নৈরাজ্য চলছে তা থেকে বিশ্বকে মুক্ত কর? তাই আসুন, এই পবিত্র রমজানে একাগ্রচিত্তে আল্লাহতায়ালার দরবারে নত হয়ে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বিশ্বের শান্তির জন্য দোয়া করি।

লেখক : ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট

 

"