মানব পাচারে সক্রিয় ১৫ চক্র টার্গেট স্বল্প আয়ের মানুষ

* ইউরোপ পাঠানোর নামে হাতিয়ে নেয় ৭-৮ লাখ টাকা * তিন রুটে লিবিয়ায় পাঠায় চক্রটি * একবার নৌপথে গেলে ফেরার পথ থাকে না

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের মানুষ, যারা অল্প খরচে বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমে বেশি আয়ের চিন্তা করেন। এ শ্রেণির মানুষকে টার্গেট করে মানব পাচারকারীরা। এরপর নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আকৃষ্ট করে। লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাঠানোর নামে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় ৭-৮ লাখ টাকা। পাঠানোর প্রক্রিয়া অবৈধ হলেও জানানো হয় না বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের। এ ফাঁদে পড়ে একবার নৌপথে গেলে ফেরার আর পথ থাকে না ভিকটিমদের।

সম্প্রতি লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ডুবে অন্তত ৩৯ জন বাংলাদেশি নিখোঁজ হন এবং জীবিত উদ্ধার হন ১৪ জন। এ ঘটনার পর বিশ্বে নতুন করে সমালোচনায় আসে বাংলাদেশ থেকে নৌপথে মানব পাচারের বিষয়টি। ঘটনার তদন্তে নামে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। তদন্তে ইউরোপে মানব পাচারের সঙ্গে দেশজুড়ে অন্তত ১০-১৫টি চক্রের তথ্য পেয়েছে র‌্যাব-১ ব্যাটালিয়ন। এর মধ্যে ৫-৬টি চক্রের মাধ্যমে পাচার হওয়া বাংলাদেশিরা সেদিন নৌ-দুর্ঘটনায় পতিত হন।

র‌্যাব বলছে, চক্রের সদস্যরা ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে দেশজুড়ে লোক সংগ্রহ করে। তারপর ওই লোকদের সড়কপথ, বিমানপথ মিলিয়ে তিনটি রুটে লিবিয়ায় পাঠায়। সর্বশেষ লিবিয়া থেকে নৌপথে তিউনিসিয়ার উপকূল হয়ে ইউরোপে পাঠায়। অর্থের বিনিময়ে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় নৌপথে ঝুঁকির বিষয়গুলো জানানো হয় না। নৌপথে নেওয়ার পর শুরু হয় কালক্ষেপণ। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে দুই মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত।

সম্প্রতি ইউরোপে পাচারে তিনটি ব্যবহৃত রুট হলোÑ বাংলাদেশ-ইস্তাম্বুল (তুরস্ক)-লিবিয়া, বাংলাদেশ-ভারত- শ্রীলঙ্কা (৪-৫ দিন অবস্থান)-ইস্তাম্বুল (ট্রানজিট)-লিবিয়া এবং বাংলাদেশ-দুবাই (৭-৮ দিন অবস্থান)-আম্মান (জর্ডান) (ট্রানজিট)-বেনগাজী (লিবিয়া)-ত্রিপলি (লিবিয়া)।

এ ক্ষেত্রে সড়কপথ ও বিমানপথ ব্যবহার করে লিবিয়ায় পৌঁছানো হয়। সর্বশেষ লিবিয়া থেকে নৌপথে তিউনিসিয়ার উপকূল হয়ে ইউরোপে পাচার করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুটি পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে আটক করে র‌্যাব-১। আটকরা হলেনÑ আক্কাস মাতব্বর (৩৯), এনামুল হক তালুকদার (৪৬) ও আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া (৩৪)।

এ বিষয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, গত ৯ মে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের নৌকাডুবিতে প্রায় ৮৫-৯০ জন নিখোঁজ হন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৩৯ জন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভিকটিমের স্বজনরা শরীয়তপুরের নড়িয়া ও সিলেটের বিশ্বনাথ থানায় দুটি মামলা করেছেন। ওই মামলার ছায়া তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে দুটি চক্রের তিনজনকে আটক করা হয়। তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ এ কর্মকান্ড চালিয়ে আসছিল। তারা প্রথমে বিদেশে গমনেচ্ছুক নির্বাচন করে, এরপরের ধাপে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া এবং সর্বশেষ ধাপে লিবিয়া থেকে তাদের নৌপথে ইউরোপে পাঠানো হয়।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘ভিকটিমদের পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট ক্রয় এই সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। ইউরোপে পৌঁছে দিতে তারা ৭-৮ লাখ টাকা অর্থ নির্ধারণ করে, যার মধ্যে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লিবিয়ায় পৌঁছানোর আগে এবং বাকি টাকা লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাত্রার আগে পরিশোধ করতে হয়। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ২ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এর মধ্যে অধিকাংশ টাকা পরিশোধ হয়ে যায়, যার ফলে ইচ্ছা থাকলেও আর ফেরত আসতে পারেন না ভুক্তভোগীরা।

ভিকটিমরা ত্রিপোলিতে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি কথিত ‘গুডলাক ভাই’সহ আরো কয়েকজন এজেন্ট তাদের গ্রহণ করে। তাদের ত্রিপোলিতে বেশ কয়েক দিন অবস্থান করানো হয়। এ সময়ে ভিকটিমদের স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকে চক্রটি। সেখানকার সিন্ডিকেট সমুদ্রপথে অতিক্রম করার জন্য নৌযান চালনা এবং দিকনির্ণয় যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর নানাবিধ প্রশিক্ষণ দেয়। একটি নির্দিষ্ট দিনে ভোররাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া হয়ে তিউনিসিয়া উপকূলীয় চ্যানেলের হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে গমনকালে ভিকটিমরা ভূমধ্যসাগরে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়’Ñ বলেন র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক।

গত ৯ মে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ বাংলাদেশিরা সিলেট, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ ও নোয়াখালীর বাসিন্দা বলে জানা গেছে। তারা ৫-৬টি চক্রের মাধ্যমে ইউরোপে যাচ্ছিলেন।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘আটক ৩ সদস্যের চক্রের মাধ্যমে কতজন সেখানে গিয়েছিলেন বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ছাড়া দেশজুড়ে ১০-১৫টি চক্রের খবর আমরা পেয়েছি। তাদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’

 

"