বাসের আগাম টিকিট

‘সোনার হরিণ’ ধরতে সারা রাত

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের জন্য বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গাবতলী ও কল্যাণপুরের কাউন্টার থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত চলবে টিকিট বিক্রি। টিকিট কিনতে এসে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার বিড়ম্বনা, দাম বেশি রাখার অভিযোগ আর কাক্সিক্ষত টিকিট না পাওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকেই। ট্রেনের টিকিটের মতো ‘সোনার হরিণ’ হওয়া বাসের টিকিট পেতে সারা রাত স্টেশনেই কাটিয়েছেন অনেকে। তবে ফেরার পথে তাদের চেহারায় বিরক্তের ছাপ দেখা যায়। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও গাবতলী, টেকনিক্যাল ও কল্যাণপুর থেকে দেশে উত্তর ও দক্ষিণের জেলাগুলোতে বাসের আগাম টিকিট বিক্রি করা হয়। তবে মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে তাৎক্ষণিক টিকিট বিক্রি করা হবে।

গতকাল শুক্রবার দেওয়া হয়েছে ২৯ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত যাত্রার টিকিট। তবে গাবতলী, মাজার রোড, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন বাসের কাউন্টার ঘুরে দেখা গেছে ২, ৩ ও ৪ জুনের টিকিটের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৫ জুন বাংলাদেশে ঈদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে কারণে আগের তিন দিনের টিকিটই বেশি চাচ্ছেন ক্রেতারা।

তারা বলছেন, প্রভাবশালীদের মন রাখতে সামনের দিকের ভালো আসনগুলো আগে থেকেই বুক করে রেখেছেন মালিকরা। আর এ জন্য তৈরি হয়েছে টিকিটের কৃত্রিম সংকট।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী গাবতলী কাউন্টারে এসেছিলেন ভোর সাড়ে ৩টায়। তিনি কাটবেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার টিকিট। সকাল ৮টার দিকে পেয়েছেন কাক্সিক্ষত টিকিট। তবে দাম নিয়ে তার রয়েছে অভিযোগ। তিনি জানান, উল্লাপাড়ার নন এসি টিকিটের দাম ৩০০ টাকা। কিন্তু নেওয়া হয়েছে ৪২০ টাকা। একইভাবে এসি বাসের টিকিট ৭০০ টাকার বদলে ১ হাজার ৩০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। আরেক যাত্রীর অভিযোগ, নওগাঁর ভাড়া অন্য সময় ৪০০ টাকা। গতকাল নিয়েছে ৫৯০ টাকা।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি চলছে। টিকিট বিক্রি মনিটরিং করা হচ্ছে। কেউ যেন নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিতে না পারে সে জন্য দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়ার চার্ট টাঙিয়ে দিতে বলা হয়েছে। কেউ নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিলে প্রমাণ সাপেক্ষে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এসআর পরিবহনের এসি বাসের টিকিট কাটতে আসা শুভ নামের এক তরুণ জানান, ‘টিকিটের জন্য সেই রাত থেকে বসে থাকলাম। কিন্তু এখন বাস কর্তৃপক্ষ বলছে এসি টিকিট দেবে না। এটা আগে জানানো উচিত ছিল, তাহলে এখানে কষ্ট করে আসতাম না।

তবে টেকনিক্যাল সমস্যা রয়েছে জানিয়ে এস আর পরিবহনের ব্যবস্থাপক আমিন নবী বলেন, কাউন্টার এবং অনলাইনে একই সময়ে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। এ কারণে সিরিয়াল ঠিক রাখা যাচ্ছে না। এসি বাস কম বলে এখন টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, তাদের এখানে যে সিট ফাঁকা আছে সেটাই তারা দিচ্ছেন। আর তাদের সাতটা এসি বাসের মধ্যে তিনটাই নষ্ট। ঈদের আগে এগুলো পাবেন কিনা নিশ্চিত না।

আলহামরা পরিবহনে গাইবান্ধার টিকিট নিতে আসা মাহবুব নামের একজন বলেন, পেছনের তিন সারির টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে জানতে চাইলে তারা বলে কল্যাণপুর থেকে সামনের টিকিট দেওয়া হয়। কিন্তু আমি সেখানে ঘুরে এসেছি। সেখানে বলেছে গাবতলী কাউন্টারে দেওয়া হচ্ছে।

আলহামরা পরিবহনের কাউন্টার কর্মী মোহাম্মদ মিঠু বলেন, তারা দুই কাউন্টার থেকে টিকিট দিচ্ছেন। কল্যাণপুরে দেওয়া হচ্ছে ‘এ’ থেকে ‘ই’ সিরিয়ালের টিকিট। আর এখানে দেওয়া হচ্ছে এফ থেকে জে পর্যন্ত সিরিয়ালের টিকিট।

পছন্দের দিনে সামনের দিকের টিকিট না পেয়ে হতাশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরক খালিদ হোসেন। তিনি ভোর ৪টায় হানিফ পরিবহনের কাউন্টারে এসেছেন। তবে সামনের সারিতে টিকিট পাননি। টিকিট চেয়েছেন ২ তারিখের, কিন্তু পেয়েছেন ৩ তারিখের। চেয়েছিলেন পাঁচটি, পেয়েছেন একটি।

তিনি বলেন, আমার ২০ জন বন্ধু মিলে টিকিট কিনতে এসেছি। কেউই সামনের দিকের টিকিট পায়নি। বুঝলাম না সামনের দিকের টিকিট কোথায় গেল।

হানিফ পরিবহনের কাউন্টারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়েরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২ জুন পঞ্চগড় যাওয়ার একটি টিকিট কিনেছেন মাসুদ ইসলাম নামে একজন। তিনি জানান, পঞ্চগড়ের ভাড়া ৬৫০ টাকা। তিন তারিখের টিকিট চেয়েছিলাম। কিন্তু দিল ২ তারিখের টিকিট। তাও দাম ২০০ টাকা বেশি, ৮৫০ টাকা রেখেছে।

হানিফ পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক মোশাররফ হোসেন বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সামনের দিকের টিকিট সকালেই শেষ হয়ে গেছে। যারা আগে এসেছেন তারা সামনের দিকের টিকিট আগেই নিয়ে গেছেন। আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়াই রাখছি। এক টাকাও বেশি রাখা হচ্ছে না।

এদিকে রাজধানীর সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনালে ২ থেকে ৪ জুনের টিকিটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। টিকিট সংগ্রহ করতে ভোররাত থেকে কাউন্টারগুলোতে ভিড় করেন টিকিটপ্রত্যাশীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তারা কাক্সিক্ষত টিকিট পাননি। অনেকের অভিযোগ, কাউন্টারের লোকজনকে অতিরিক্ত টাকা দিলেই কাক্সিক্ষত টিকিট পাওয়া যায়। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে রয়েল, স্টারলাইন, তিশা, দোয়েল, ঈগল, হানিফ, সোহাগ, শ্যামলী, একে ট্রাভেলস, এস আলমসহ বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টারে ছিল মানুষের দীর্ঘ লাইন।

সায়েদাবাদে চট্টগ্রামের টিকিট কিনতে আসা নেয়ামুল করিম জানান, চট্টগ্রামের জন্য ৩ জুনের টিকিট কিনতে ভোররাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এস আলম কাউন্টারে সকাল ৮টায় টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টা পর কাউন্টার থেকে বলা হচ্ছে টিকিট শেষ। পরে কাউন্টারের লোকজনকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করেছেন।

 

"