কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

কলকাতায় অমিত শাহের রোডশো ঘিরে ধুন্ধুমার। সেখানে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার দায় কার, তা নিয়ে বিজেপি-তৃণমূলের মধ্যে চলছে চাপানউতোর। কিন্তু পরের দিনই পশ্চিমবঙ্গে ভোট প্রচারে এসে সেই মূর্তি ভাঙা নিয়ে একটি কথাও বলেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অমিত শাহের সমর্থনে বা তৃণমূলের বিপক্ষেও এ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া টাকির জনসভায় কোনো মন্তব্য করেননি নরেন্দ্র মোদি। শুধু বলেছেন, দিদি বলেছিলেন, ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বদলা নেব। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গু-ারা অমিত শাহের রোডশোতে হামলা চালিয়েছে। এর আগে রাজ্যে ভোট প্রচারে এসে প্রায় প্রতিটি সভাতেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তার মধ্যেই মঙ্গলবার অমিত শাহের রোডশোয়ে অশান্তির ঘটনা ঘটেছে। এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাতবারণে প্রধানমন্ত্রী কী বার্তা দেন, তার দিকে নজর ছিল সবপক্ষের। বসিরহাট কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী করেছে ‘কুকথার জন্য বিখ্যাত’ সায়ন্তন বসুকে। তার প্রতিপক্ষ তৃণমূলের তারকা প্রার্থী অভিনেত্রী নুসরত জাহান। মূল লড়াই এ দুজনের মধ্যে হলেও ময়দানে রয়েছেন কংগ্রেসের প্রার্থী কাজী আবদুর রহিম এবং সিপিএমের পল্লব সেনগুপ্ত। সেখানেই প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতা হারানোর ভয়ে কাঁপছেন মমতা। বলেছেন, এই বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজির মতো মহাপুরুষরা জন্মেছেন, তারা দিদির এই একনায়কতন্ত্র ক্ষমা করবেন না। সব মিলিয়ে এনডিএ কোথায় যাবে, তা ভেবে দেখুন দিদি। পুরো ভোট শেষে একা বিজেপিই ৩০০-এর বেশি আসন পাবে আর তাতে বাংলার বড় ভূমিকা থাকবে। দিদি- আপনি জেনে রাখুন, ষষ্ঠ দফা পর্যন্তই বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেছে। আজ দিদি আপনার ছায়া দেখেই কাঁপছেন, ওর পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে, সে কারণেই আপনার গালি এবং হুমকির কোনো ফল আমার ওপর পড়ে না। আপনি জানেন না, মোদিকে রক্ষা করার জন্য ১৩০ কোটি দেশবাসী রয়েছেন। আপনি কী মনে করেন, মোদি আপনার গালাগালে ভয় পাবে?

এদিকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে তোলপাড় পশ্চিমবঙ্গে, কারা মূর্তি ভাঙল, তাই নিয়ে চলছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, আমিত শাহের রোডশো থেকে কলেজে ঢুকে তা-ব চালিয়েছে বিজেপি সমর্থকরা। বিজেপি নেতৃত্বের পাল্টা অভিযোগ, নিজেরাই মূর্তি ভেঙে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে বিজেপির ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে তৃণমূল। এই তরজার মধ্যেই একাধিক ভিডিও শেয়ার করে বিজেপির বিরুদ্ধেই মূর্তি ভাঙার প্রমাণ দিতে চেয়েছেন তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ওব্রায়েন। অন্যদিকে কলকাতাতেও একই কায়দায় ভিডিও চালিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব তথা রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় কার্যত আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, এই তা-বকারীরা বিজেপি সমর্থক। পরে নির্বাচন কমিশনেও ভিডিওসহ তথ্যপ্রমাণ দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে তৃণমূলের তরফে। মঙ্গলবার বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের রোডশো ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদ্যাসাগর কলেজ চত্বরে। তারপর বিদ্যাসাগর কলেজে কার্যত রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি তৈরি হয়। রোডশো শেষে দেখা যায়, বিদ্যাসাগর কলেজের ভেতরে থাকা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ ছাড়া বাইক এবং সাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ভিডিও সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে।

ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার বিকেলে বেলেঘাটার গান্ধী ভবন থেকে উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার পর্যন্ত পদযাত্রা করেছেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় দাঙ্গা থামাতে বেলেঘাটার এই আশ্রমে অনশন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। মমতার দাবি, বিজেপি আবার এই রাজ্যে দাঙ্গা বাধাতে চাইছে। এদিকে রোববার শেষ দফার ভোট। তার আগে নির্বাচনী প্রচারে মোড়ই কার্যত ঘুরে গেছে কলকাতায় অমিত শাহর রোডশো থেকে। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুর হওয়ার পর কার্যত বাঙালি ভাবাবেগ নিয়েই প্রচারে নেমেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার দমদম লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত আগরপাড়ার নির্বাচনী জনসভা থেকে মমতা বলেছেন, গু-া দিয়ে বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছে বিজেপি। রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খ- থেকে লোক এনে বাংলায় অশান্তি করার চেষ্টা করছে দাঙ্গাবাজরা। মমতা বলেছেন, এরা (পড়ুন বিজেপি) বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দকে জানেই না। এরা দেখবে বাঙালিকে! ঘটনার জন্য বিজেপিকে কাঠগড়ায় তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজেপি নেতা রাকেশ সিংয়ের একটি ভাইরাল হওয়া ভিডিও সভায় শুনিয়েছেন, যেখানে স্পষ্টতই অমিত শাহর মিছিলে লাঠিসোটা নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন রাকেশ। সভা থেকে মোদিকে ‘নির্লজ্জ’ বলেও আক্রমণ করেছেন মমতা। শুধু তা-ই নয়, নির্বাচনী প্রচারে মঞ্চে বিদ্যাসাগরের ছবিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতেও প্রচার শেষে বিদ্যাসাগর কলেজ গিয়ে পরিদর্শনের পর, বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি।

অন্যদিকে, তার একটি ছবি আঁকার জন্য টাকির সভা থেকে মমতাকে আবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কটাক্ষের সুরে বলেছেন, ২৩ মে’র প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দিল্লির আবাসে এসে উপহার দিন, ওই ছবি। মেট গালায় অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মেকআপ অনুকরণে মমতার ছবি বিকৃতির অভিযোগে, হাওড়ার বিজেপি নেত্রী প্রিয়াঙ্কা শর্মাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ১৪ দিনের জেলা হেফাজতে নেওয়া হয় প্রিয়াঙ্কাকে। ঘটনার উল্লেখ না করেই মমতাকে বিঁধেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বসিরহাট কেন্দ্রে টাকির সভায় মোদি বলেছেন, মমতার ঔদ্ধত্যের সবক শেখাবেন, বাংলার মেয়েরাই। বাংলা মা দুর্গা ও সরস্বতীর ভূমি। মহিলাদের অপমান মানে মায়ের অপমান। একটা ছবির জন্য এত রাগ! এরপরই মোদির কটাক্ষ, আপনি নিজেই শিল্পী। শুনেছি, নারদা-সারদা নাম জপ করে কোটি টাকায় বিক্রি হয় আপনার ছবি। বাংলার মাটি থেকে আপনাকে বলছি, আপনার রাগ ঠা-া করার জন্য আমার একটি কুৎসিত ছবি আঁকুন। ২৩ মে ভোটের ফলপ্রকাশের পর তিনিই যে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তার ঘোষণা এদিনই করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তার প্রত্যয়ী মন্তব্য, ২৩ মে-র পর প্রধানমন্ত্রীর শপথ হওয়ার পর নিবাসস্থলে আসুন। ওই বাজে ছবি আমায় উপহার দিন। আমি রেখে দেব, আপনার নামে এফআইআর করব!

এর আগে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করছে বলে গতকাল বুধবার দিল্লির বিজেপি দফতরের সাংবাদিক বৈঠকে অভিযোগ করেছেন, সভাপতি অমিত শাহ। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে তৃণমূলের ওপরই পাল্টা তোপ দেগেছেন তিনি। তার অভিযোগ, তৃণমূলের কর্মীরাই মূর্তি ভেঙেছে। কলেজের সদর দরজা বন্ধ থাকায় বিজেপির সমর্থকরা কীভাবে ভেতরে ঢুকবে প্রশ্ন তোলেন অমিত শাহ। সংবাদ সম্মেলনে অমিত শাহ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকেও এক হাত নিয়েছেন। অভিযোগ করেছেন, বাংলায় কমিশন পক্ষপাতিত্ব করছে। অমিত শাহের কথায়, দেশের ১৬টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। কোথাও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিংসার ঘটনা ঘটেনি। এমনকি ওড়িশার প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। একমাত্র বাংলায় তৃণমূলের কারণে প্রত্যেক দফায় হিংসা হয়েছে বলে অভিযোগ বিজেপি সভাপতির। মঙ্গলবার রাতে বিদ্যাসাগর কলেজ পরিদর্শন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হুশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে জবাব দেবেন। মূর্তি ভাঙার পেছনে বিজেপিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করান মুখ্যমন্ত্রী। অমিত শাহ পাল্টা বলেছেন, বাংলা থেকে ২৩-এর বেশি আসন পাবে বিজেপি। এমনকি তার দাবি, দেশে ৩০০-এর বেশি আসন পেয়ে ফের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে বিজেপি। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে নজিরবিহীন হিংসা হচ্ছে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন অমিত শাহ। আর নির্বাচন কমিশনকেও একইভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিকবার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসও।

 

"