মাংসের দাম

গ্রাম থেকে গরু আনতেও ঘাটে ঘাটে টাকা

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মালিকানাধীন গাবতলী পশুর হাটে ইজারার শর্তে বলা আছে, সাধারণ ক্রেতাদের জন্য প্রতিটি পশুর মূল্যের ওপর সাড়ে ৩ শতাংশ এবং ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঈদের দিনসহ আগের চার দিনের জন্য পাঁচ শতাংশ খাজনা (হাসিল) আদায় করতে হবে। তবে বছরের যেকোনো সময়ে মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য ছাগল ও ভেড়াপ্রতি ৩৫ টাকা, গরুপ্রতি ১০০ টাকা ও মহিষপ্রতি ১৫০ টাকা খাজনা আদায় করতে হবে। কিন্তু মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইজারাদাররা এই শর্ত মানছেন না। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো পশুর খাজনা আদায় করে থাকেন। ১ লাখ টাকা দামের একটি গরুতে যেখানে ১০০ টাকা খাজনা দেওয়ার কথা, সেখানে আদায় করা হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। আর ৩ লাখ টাকার গরুতে খাজনার পরিমাণ ১০ হাজার ৫০০ টাকা। এ কারণে মাংসের দামও বেড়ে যায়।

গাবতলী হাটে খাজনা নিয়ে কথা হয় এক গরুর ব্যাপারী বলেন, ক্রেতাদের যেমন অতিরিক্ত খাজনা দিতে হয় ঠিক বিক্রেতা বা গরু ব্যবসায়ীদেরও পথ পথে অতিরিক্ত খাজনা দিতে হচ্ছে। গ্রাম থেকে একটি গরু ঢাকায় আনতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়ে।

তিনি জানান, দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে গরুর কোনো ট্রাক যখন গাবতলী হাটে প্রবেশ করে সেখানে পশু নামানোর স্থানে (তাদের ভাষায় বিট বলা হয়) দিতে হয় আড়াই হাজার টাকা। এছাড়া শ্রমিক বাবদ আরো ৬০০ টাকা দিতে হয়। পশু বিক্রি না হলে কিংবা অন্য হাটে নিতে হলে পশু বের করার সময় ফের আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়।

এই ব্যাপারী আরো জানান, সাধারণ মানুষ যদি কোনো পশু ক্রয় করেন তাহলে তাকে মোট দামের ওপরে সাড়ে ৩ শতাংশ খাজনা দিতে হয়। ক্রেতা মাংস ব্যবসায়ী হলে ৫০ হাজার টাকার গরুর জন্য ৫০০ টাকা এবং তার ওপরে দাম হলে ১ হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া রয়েছে ট্রাক ভাড়া, শ্রমিক খরচ, ব্যাপারীর লাভ ও থাকা-খাওয়ার খরচ তো আছেই। এই পুরো খরচই পশুর দামের ওপরে পড়ে। আর এভাবেই পশুর দাম বেশি হওয়ায় মাংস ব্যবসায়ীরা দামও বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য ছাগল ও ভেড়াপ্রতি ৩৫ টাকা খাজনা হলেও ইজারাদার আদায় করছে ১০০ টাকা করে। এক্ষেত্রে ব্যাপারীকেও দিতে হয় ১০ টাকা।

একই অভিযোগ ঢাকার এক মাংস ব্যবসায়ীরও। তিনি বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে মাংস ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু মাংস ব্যবসায়ী হিসেবে সিটি করপোরেশন যে সুবিধা দিয়েছে, আমরা সেই সুবিধাটুকু পাই না। হাটে সাধারণ ক্রেতাদের মতোই আমাদেরও গরুপ্রতি খাজনা দিতে হয়।

এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন ইজারাদাররা। তারা বলছেন, গাবতলী হাটে চাঁদাবাজি বা অতিরিক্ত খাজনা আদায় করা হয় না। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত হারেই তারা খাজনা নেন। অতিরিক্ত খাজনার কারণে মাংসের দাম বেশি পড়ে মাংস ব্যবসায়ীদের এই দাবিকে অযৌক্তিক বলছেন তারা।

এ বিষয়ে গাবতলী পশুর হাট কর্তৃপক্ষের সদস্য সানোয়ার হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীরা শুধু গাবতলী হাট থেকেই পশু কেনেন না। তারা অন্য হাট থেকেও গরু কেনেন। গাবতলী ছাড়া আরিচা হাটে ৫১০ টাকা, আশুলিয়ায় ৪০০, কেরানীগঞ্জের পাড়াগাঁওয়ে ৪০০, ফরিদপুরের অরুণখোলায় ৬০০, ধামরাইয়ে ৫০০, কমলাপুরে ৪০০, রাজশাহী সিটিতে ৪৫০, কালিয়াকৈরের কাইতলায় ৩৫০, বাইনাপাড়া হাটে ৪০০ টাকা করে খাজনা আদায় করা হয়। সেই তুলনায় গাবতলী হাটে খাজনা অনেক কম। বরং এই হাটে সরকার নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। ফলে রাজধানীতে মাংসের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, গাবতলী হাটের ইজারাদারের চাঁদাবাজির কারণেই মাংসের দাম বেশি পড়ছে। মাংস ব্যবসায়ীদের থেকে ১০০ টাকা হাসিল আদায়ের কথা থাকলেও তারা গরুপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করে থাকেন, যার প্রভাব পড়ে গিয়ে মাংসের দামের ওপরে। এই চাঁদাবাজি বন্ধ হলে রাজধানীবাসীকে ৩০০ টাকা দামে মাংস খাওয়ানো যাবে।

সম্প্রতি নগরীর হাতিরপুল কাঁচাবাজার পরিদর্শন শেষে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনও গাবতলী হাটে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ঢাকা শহরের কাঁচাবাজারগুলোতে মাংস বিক্রির জন্য অধিকাংশ গরু গাবতলীর পশুর হাট থেকে কেনা হয়। এই হাটে চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগ আছে। এই চাঁদাবাজি কমলে গরুর মাংসের দাম অনেকটাই কমে আসবে। চাঁদাবাজির বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে।

এর আগে রমজান উপলক্ষে মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে মহানগরীর মাংস ব্যবসায়ীরা ঢাকা দক্ষিণের মেয়রের কাছে গাবতলী হাটে চাঁদাবাজির অভিযোগ করলে; মেয়র বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন। যদিও গাবতলী হাটের মালিক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। মাংস ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উত্তর সিটি করপোরেশন তাদের অভিযোগ আমলে নিচ্ছে না। এমনকি রমজান উপলক্ষে তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকও করছে না।

 

"