নরেন্দ্র মোদির দাবি

পরাজয় নিশ্চিত জেনেই বিরোধীদের গালাগাল

কলকাতায় বিজেপির জমজমাট রোডশো

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

পরাজয় নিশ্চিত জেনেই বিরোধীরা তাকে গালাগাল করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিহারের বক্সারের জনসভা থেকে মোদি বলেছেন, আমি সারা জীবন গরিবের সঙ্গে থেকে ওদের জন্যই কাজ করেছি। তাই আমাকেই এখন গালাগাল দিয়ে রাগ কমাচ্ছে বিরোধীরা। সেসঙ্গে বিরোধীদের জোটকে ‘মহামিলাবাট’ সরকার বলে কটাক্ষও করেছেন তিনি। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেছেন, ওরা (পড়ুন বিরোধীরা) জিততে পারবে না। তাই হতাশ হয়ে পড়েছে। জনতার উদ্দেশে তার প্রশ্ন আপনারা কী এমন সরকার চান, যারা আপনাদের দাস করে রাখতে চায়? লোকসভা ভোটের মাঝেই মেঘের আড়াল থেকে এয়ারস্ট্রাইক, ১৯৮৮ সালে ডিজিটাল ক্যামেরা-ই-মেলের ব্যবহারের কথা বলে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘অসত্য’ তথ্য দেওয়ার জন্য এবার বিরোধীদের আক্রমণেরও শিকার হচ্ছেন মোদি। এর মধ্যেই বিরোধীদের নস্যাৎ করতে ফের সন্ত্রাসবাদ ইস্যু তুলে ধরে মোদি বলেছেন, আমরা সন্ত্রাসবাদী আর মাওবাদীদের ধ্বংস করতে চাই আর কংগ্রেস ও সমর্থনকারী দলগুলো ওদের রক্ষা করতে চায়। দেশের নিরাপত্তার জন্য কংগ্রেসসহ বাকি দলগুলো বিপজ্জনক।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কলকাতায় রোডশোকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দিনভর। ধর্মতলা থেকে স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ির সিমলা স্ট্রিট পর্যন্ত রোডশো করছেন তিনি। বর্ণময় শোভাযাত্রার মধ্যেই তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে টুঁটি চিপে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই নির্বাচনে তার জবাব দেবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। এর মধ্যেই অমিত শাহকে কালো পতাকা দেখানো হয়েছে কলেজ স্ট্রিটে। সেখানে পোস্টার নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সমর্থকরা। ঘটনাস্থলে হাজির হন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সমর্থকরাও। পরিস্থিতির মোকাবিলায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিশাল পুলিশ বাহিনী। মধ্য কলকাতায় হিন্দ সিনেমার কাছেও বিক্ষোভ দেখানো হয় অমিত শাহকে। এখানে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেয় তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। অমিত শাহের রোডশো ঘিরে রীতিমতো উৎসবের চেহারা ছিল মধ্য কলকাতায়। রোডশো চলাকালীনই অমিত শাহ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন আনবে বিজেপি। আগামী ২৩ মে রাজ্যে ২৩টিরও বেশি আসনে জিতে সেই পরিবর্তনের সূচনা করবে বিজেপি। রোডশো শুরুর আগেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল কলকাতার লেনিন সরণিতে। ভেঙে দেওয়া হয়েছে মঞ্চ, কাট-আউট এবং পোস্টার, এই অভিযোগে পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। বেশ কিছুক্ষণের জন্য লেনিন সরণি অবরোধও করেন তারা।

এদিকে, এখনো সপ্তম দফা শেষ হয়নি এর মধ্যেই আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, বিজেপি এবং তার শরিকদের। রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়ার (আঠাওয়ালে) সুপ্রিমো তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আঠাওয়ালের দাবি, ২০১৪ সালের মতো বিজেপি এবারে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তার আরো দাবি, উত্তর প্রদেশ এবং মধ্য প্রদেশে বেশকিছু আসন খোয়াতে হবে বিজেপিকে। আঠাওয়াল জানিয়েছেন, উত্তর প্রদেশে সপা, বসপা এবং রাষ্ট্রীয় লোক দল এক সঙ্গে জোট করায় ১০ থেকে ১২টা আসন হারাতে পারে বিজেপি। উল্লেখ্য, গত লোকসভায় সপা, বসপা ও আরএলডি পৃথকভাবে লড়েছিল। মহরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও শিবসেনা-বিজেপি জোটে চিড় ধরতে পারে বলে মনে করছেন প্রবীণ রাজনীতিক রামদাস। সেখানে ৫ থেকে ৬টি আসন হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বিজেপির। পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা এই ক্ষত পূরণ করবে বলে তিনি দাবি করেছেন। আঠাওয়ালের মতো শিবসেনাও মনে করছে এবারে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। শরিকদের হাত ধরেই সরকার গড়তে হবে বিজেপিকে। উল্লেখ্য, বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবও একই ইঙ্গিত দিয়েছেন কদিন আগে। তার কথায়, বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারবে না। তবে গতবারের মতো একাই ২৮২টি আসন বিজেপি পাচ্ছে না। প্রয়োজনে শরিকদের সাহায্য লাগবে বলে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবও মনে করেন।

এর মধ্যেই লোকসভা ভোটের শেষ দফার ভোটগ্রহণের পারদ চড়ছে কলকাতায়। জোর কদমে চলছে ভোট প্রচারও। যাদবপুর কেন্দ্রের দলীয় প্রার্থী মিমি চক্রবর্তীর সমর্থনে নির্বাচনী জনসভা করেছেন, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যাদবপুরে মিমির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী অনুপম হাজরা এবং বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। অনুপম আগের লোকসভা নির্বাচনে, বোলপুর কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। কিছু দিন আগেই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন অনুপম। অন্য দিকে বামপ্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বিশিষ্ট আইনজীবী তথা কলকাতার সাবেক মেয়র। ফলে এই কেন্দ্রে কার্যত হেভিওয়েট ফাইট। যাদবপুর কেন্দ্রের অন্য তাৎপর্যও রয়েছে। এই কেন্দ্র থেকেই নির্বাচিত হয়ে প্রথম লোকসভায় পা রেখেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হারিয়েছিলেন সাবেক লোকসভার অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে। আর সেখানেই তার আমলে রাজ্যের কোনো উন্নতি হয়নি, বিজেপির প্রচার নিয়ে মুখ খুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছেন, ওরা (পড়ুন বিজেপি) হয় জানে না, নয়তো জেনেও মিথ্যে কথা বলছে। তিনি যখন বলছেন, নরেন্দ্র মোদির সার্টিফিকেট নেওয়ার দরকার নেই। আগের বাম আমলের দেনা শোধ করে তিনগুণ আয় বাড়িয়েছেন। প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি টাকা বাম জমানার দেনা মেটাতে হয়।

পাশাপাশি চলেছে নির্বাচন কমিশনের ওপরে চাপ বাড়ানোর প্রক্রিয়াও। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকার। তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহার, ভোটের দিন অতি সক্রিয়তা এবং গুলি চালানোর অভিযোগে সরব হয়েছে। খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ নিয়ে নির্বাচনের বিভিন্ন সভা মঞ্চে ক্ষোভ উগ্রে দিয়েছেন। এত দিন বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধুমাত্র রাজনীতির পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল। এবার সরকারিভাবেও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) আরিজ আফতাবকে চিঠি অভিযোগ জানানো হয়েছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব অত্রি ভট্টাচার্য, চিঠিতে জানিয়েছেন, গত কয়েক দফার ভোটে বিনা প্ররোচনায় লাঠিচার্জ করছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। ভোটের লাইনে যারা দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করা হচ্ছে। এমনকি গত রোববার ষষ্ঠ দফার নির্বাচনে গোপীবল্লভপুর, ময়না, বিষ্ণুপুর, ভগবানপুর এবং সবংয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালিয়েছে। চতুর্থ দফার ভোটের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, পারুই এবং দুবরাজপুরেও গুলি চলেছিল। পঞ্চম দফায় হাওড়ায় তৃণমূল প্রার্থী প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরের লাঠিচার্জ এবং মারধরের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে ওই চিঠিতে।

 

"