স্বকীয়তা হারাচ্ছে রাইড শেয়ারিং

আস্থা অর্জনে হোঁচট চিড় ধরেছে সেবায়

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

যানজট থেকে স্বস্তি, নিরাপদ, আরাম ও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশ জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থার নাম অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং। বিগত তিন-চার বছরের মধ্যে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবার চেষ্টা থাকলেও সম্প্রতি এ সেবায় কিছুটা চিড় ধরেছে। নিরাপত্তা ও আইনের প্রশ্নেও পিছিয়ে পড়েছে রাইড শেয়ারিং। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখা রাইড শেয়ারিং মানুষের কাছে আস্থা অর্জনে যেন হোঁচট খাচ্ছে বারবার। ফলে স্বকীয়তা হারাতে বসেছে অ্যাপসভিত্তিক এই সেবা।

অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম না মেনে রাইড দেওয়া, রাতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি দাবি করা, অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য, যৌন হয়রানির শিকার হওয়া, অদক্ষ চালকের কারণে দুর্ঘটনা, ট্রাফিক আইন না মেনে চলা, মাত্রাতিরিক্ত গতিতে যান চালানোসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও খামখেয়ালিপনার। এদিকে, অ্যাপস ব্যবহার করে বাইক বা গাড়ি চালাতে যেসব কাগজপত্র রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে থাকে, তার সত্যতা যাচাইয়ে নেই কোনো পদক্ষেপ। ‘পাঠাও’-এর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, কাউকে রাইডার হতে হলে অ্যান্ড্রয়েড ফোন থাকতে হবে, ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে, বাইক বা কারের রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে, জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। এসব কাগজপত্র নিলেও তার সত্যতা যাচাই করার ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। সঠিক কাগজপত্র থাকলেও অনেক রাইডার ঠিকমতো বাইক বা গাড়ি চালাতে পারে না বলেও জানা যায়। সম্প্রতি রাজধানীতে ‘উবার মোটো’র দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নিহত হওয়ার পর এসব প্রসঙ্গ আবার আলোচিত হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, উবারচালক যে ঠিকানাসহ যেসব কাগজপত্র জমা দিয়ে নিবন্ধন করেছিলেন, তার সবই ছিল ভুয়া। এর সবকিছুই যাত্রী নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকিস্বরূপ।

প্রসঙ্গত, রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফরম হিসেবে রাজধানীতে উল্লেখযোগ্য হলো স্যাম, উবার, পাঠাও, মুভ, লেটস গো, ইজিয়ার, ওভাই, ডাকো ক্যাপ্টেইন, সহজ রাইড ও আমার বাইক। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটির শুধু মোটরসাইকেল অথবা শুধু প্রাইভেট কারের শেয়ারিং সেবা দিচ্ছে। তবে বেশির ভাগই মোটরসাইকেলের পাশাপাশি প্রাইভেট কারও জোগান দিচ্ছে। মুভ বা ওভাইয়ের মতো প্ল্যাটফরমগুলোতে বাইক বা গাড়ির পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে অটোরিকশা, মাইক্রোবাস এমনকি পিকআপও।

‘উবার’, ‘পাঠাও’ কিংবা অন্য কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তাব্যবস্থার অনেক ঘাটতি পাওয়া গেছে। কেউ এখানে সহজেই ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে নিবন্ধন করতে পারে। রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারী বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিরাপত্তাহীনতা ও চালকের ওপর ভরসার বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বনশ্রী এলাকার এক শিক্ষার্থী নিহাল বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ে চালককে না চিনে শুধু প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করেই গাড়িতে চড়তে হয়। কিন্তু উঠে যদি দেখা যায়, চালক বেশ অনাড়ি এবং দ্রুতগতির। তখন ওই অ্যাপস কোম্পানির ওপর আর বিশ্বাস থাকে না। অনেক সময় চালক অসদাচারণ করে থাকেন এবং এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর কিছুই করার থাকে না। আবার অভিযোগের সুযোগ থাকলেও সেটিতে প্রবেশ করার প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

অন্যদিকে, ২০১৭ সালে আরো এক বছর আগে রাইড শেয়ারিং নীতিমালা হলেও সে অনুযায়ী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন হয়নি। নীতিমালার কয়েকটি ধারা নিয়ে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের আপত্তি এবং পুলিশের পৃথক কয়েকটি সুপারিশের কারণে নীতিমালা এখন পর্যন্ত কাগজে-কলমেই আটকে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে কথা না বলে শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নীতিমালা তৈরির কারণে এটি সর্বতোভাবে গ্রহণযোগ্য নীতিমালা হয়নি।

আর রাইডারদের পাশাপাশি রাইড ব্যবহারকারীরাও বেশ কয়েকটি সমস্যার কথা জানান। তাদের মতে, যে সমস্যাগুলো দেখা যাচ্ছে, তা অল্পতেই সমাধান করা যায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম প্রতিদিনই রাইড শেয়ারিং অ্যাপে চলাচল করেন। তিনি জানান, রাইডাররা ঝুঁকি নিয়ে বাইক চালিয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠানগুলোও রাইডের পরিমাণ দেখছে, গুণগত মান দেখছে না। যানবাহনের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা দরকার। শুধু লাভের জন্য বেশি রেজিস্ট্রেশন দিলে একসময় চাহিদা থাকবে না। বেশি রেজিস্ট্রেশন দিলে বিশৃঙ্খলা বাড়বে এবং অনেক বেকারের জন্ম হবে বলেও মনে করেন তিনি।

রাইড ব্যবহারকারী সাহেদ আলম জানান, এক দিন তিনি কারওয়ান বাজার থেকে পুরান ঢাকায় যেতে ‘পাঠাও’ বাইক ডাকলে অ্যাপসে ভাড়া দেখিয়েছিল ১৫০ টাকা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দেখেন ভাড়া ২৫০ টাকা। তিনি জানান, অনেক সময় রাইডার চুক্তি গ্রহণ করেও ব্যবহারকারীকে তুলে না নিয়ে চলে যান। এ সময় রাইডার সরাসরি অন্য কারো সঙ্গে চুক্তি করে চলে যান। এতে রাইডার দুজনের কমিশনই পান। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বিষয়টির সত্যতাও পাওয়া যায়।

‘পাঠাও’-এর জনসংযোগ কর্মকর্তা ওমর ফারুখ জানান, যদি কোনো রাইডার নিয়ম না মানেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাইডার ও ব্যবহারকারী দুজনই আমাদের গ্রাহক। দুদিকের স্বার্থই দেখতে হয়। তবে সব সময়ে যে ব্যবহারকারীও নিয়ম মেনে চলেন বা ভালো ব্যবহার করেন তা কিন্তু নয়। তিনি আরও জানান, তারা রাইডারকে প্রশিক্ষণ দেন। তার ব্যবহার থেকে শুরু করে সবকিছুতেই কোম্পানি দেখভাল করে থাকে। নিয়মকানুন শেখানো হয়, তারপর তাকে রাস্তায় পাঠানো হয়।

 

"