নজরদারির পরও বাজারে সক্রিয় অসাধু চক্র

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০

হাসান ইমন

রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে দোকানে মূল্যতালিকা টানানো, ওজনে কম না দেওয়া, পচা-বাসি খাবার বিক্রি না করাসহ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছিল সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এসব নির্দেশনা মেনে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসা পরিচালনা করবে বলে আশ্বাসও দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা। কিন্তু রমজান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পুরো বিপরীত চিত্র। অর্থাৎ দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন থেকে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার মনিটরিংয়ে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রশাসনের নির্দেশনা না মানার অনেক প্রমাণ পেয়েছেন। তারা বাজারে গিয়ে দেখেন মনিটরিং টিম উপস্থিত হলে যথাযথ দাম নেওয়া হয় আর টিম চলে গেলে পুনরায় বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেন অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। এতে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।

রাজধানীর মহাখালী, কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজারসহ আরো কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দোকানে মূল্যতালিকা টানানো হয়নি। কিছু দোকানে তালিকা দেখা গেলেও তা ম্যাজিস্ট্রেট আসার খবর শুনে টানানো। আবার অনেক দোকানে তালিকার সঙ্গে পণ্যমূল্যের মিল নেই। আরিফ চৌধুরী নামে এক ক্রেতা জানান, বাজারের দোকানগুলোতে কোনো মূল্যতালিকা নেই। দাম নিয়ে আমরা শঙ্কিত। বেশি দামেই পণ্য কিনতে হচ্ছে আমাদের।

অন্যদিকে প্রতি বছর রমজানের কয়েক দিন আগেই গরুর মাংসসহ অন্যান্য মাংসের দাম নির্ধারণ করে দেন সিটি করপোরেশনের মেয়ররা। তবে, সেই নির্ধারিত দাম কমই মানেন ব্যবসায়ীরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানাভাবেই বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালালেও ব্যর্থই হয়েছে সরকারের বিভিন্ন মহল। তিন মাস ধরেই এ নৈরাজ্য চলে আসছিল। অবশ্য প্রথম রমজান থেকেই মাঠে নেমেছেন সিটি করপোরেশন পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়েই বেশি দামে মাংস বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মনিটরিং টিম চলে গেলে মাংস ব্যবসায়ীরা মূল্য তালিকাও সরিয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রায় তিন মাস আগে থেকে কয়েক দফা বাড়িয়ে মাংস বিক্রেতারা ৪৫০ টাকা কেজি দরের মাংস ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি করছিলেন। রোজার আগে সিটি করপোরেশন ২৫ টাকা কমিয়ে দাম ঠিক করে দিয়েছিল ৫২৫ টাকা। কিন্তু প্রথম রোজার দিন থেকেই বেশির ভাগ এলাকায় প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৫৫০-৬০০ টাকায়। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর এলাকাগুলোতে এমন চিত্র দেখা গেছে।

গতকালও রাজধানীতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে গরুর মাংস বিক্রি হয়নি। মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকটি চক্র চাঁদাবাজি করছে, যা এখন অসহনীয় পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। চাঁদা দিয়ে নিজেদের লাভ ঠিক রাখতে ব্যবসায়ীরা পকেট কাটছে ভোক্তাদের। ব্যবসায়ীদের দাবি, মাংসের চাহিদার বেশির ভাগই পূরণ হচ্ছে ভারতীয় গরুর মাধ্যমে। এবার সীমান্তে বেশ কড়াকড়ির কারণে খুব একটা গরু আসছে না। ফলে গত তিন মাসে দামটা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এ ছাড়া ভারতীয় গরুর জন্য সীমান্তের দুই পাশের চক্রকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে। অন্যান্য চাঁদা তো আছেই। চাঁদাবাজি বন্ধ হলে ৩০০ টাকা কেজি দরে গরুর মাংস বিক্রি করা সম্ভব।

মতিঝিল, কমলাপুর, বাসাবো, শাহজাহানপুর, রামপুরা বাজার ও বাজারের কাছাকাছি প্রায় সবগুলো দোকানেই দেখা গেছে, গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৫৫০ টাকা কেজি দরে। ধানমন্ডির বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হয়েছে ৫৫০-৫৮০ টাকায়। খিলগাঁওয়ের কয়েকটি দোকানেও একই দামে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে। কমলাপুরের একটি মাংসের দোকান বিসমিল্লাহ মাংস বিতান। এই দোকানের বিক্রেতা ৫৫০ টাকা করে মাংস বিক্রি করছিলেন। একটি সাদা কাগজে এ দাম লিখে দোকানটিতে টানানো হয়েছে। ৫২৫ টাকা সরকার নির্ধারিত দাম হলেও কেন বাড়তি দামে বিক্রি করছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন চাইলে নেন, না চাইলে না নেন। ৫৫০ টাকা বেইচাও লাভ হয় না। তিনি বলেন, পোষানো যায় না। রোজায় সবকিছুর দামই একটু বাড়ে। আমরা কী দোষ করছি।

নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে মাংস বিক্রি হচ্ছে বলে জানান সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। আবার প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির গরমিলের বিষয়ে অবগত আছেন খোদ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। তবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-১-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, সেগুনবাগিচার একটি মাংসের দোকানে সিটি করপোরেশন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে মাংস বিক্রি করার সময় এক বিক্রেতাকে হাতেনাতে আটক করে। হাজি আফজাল মিয়া নামে ওই ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকার আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মীর নাহিদ আহসান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা যেসব বাজারে গিয়েছি মোটামুটি সব জায়গায় নির্ধারিত দামেই মাংস বিক্রি করতে দেখেছি। তবে এমন অভিযোগ পাচ্ছি, আমরা চলে এলে বা না থাকলে বেশি দামে মাংস বিক্রি হয়। এ বিষয়টিও আমরা খতিয়ে দেখছি। প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেব।

গরুর মাংসের মতোই কাঁচা মরিচ, বেগুন ও লেবু বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১০০-১২০ টাকা, বেগুন ৬০-৯০ টাকা এবং আকারভেদে প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৩০-৫০ টাকা পর্যন্ত।

 

"