মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ঘেরা ইরানের চারদিক

মধ্যপ্রাচ্যে আবার উত্তেজনা

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে আবার উত্তেজনার পারদ চড়ছে। ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হচ্ছে ইরানকে। ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নতুন প্রযুক্তির প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্যাট্রিক শানাহান নতুন প্রযুক্তির এই ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের বিষয়টি অনুমোদন করেছেন। এছাড়া ইরান হামলা চালাতে পারে এমন মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রণসাজে সজ্জিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর আগে থেকেই ইরানের উদ্দেশে রণতরী নিয়ে লোহিত সাগরের সুয়েজ খালে অবস্থান নিয়েছে মার্কিন নৌবহর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধের আলামত ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন ট্রিগারে টান পড়লেই ছুটবে বারুদের গন্ধ। এই অবস্থায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, বারবার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ইরাকের সঙ্গে ১৯৮০-৮৮ সালের যুদ্ধের সময়ের চেয়েও পরিস্থিতি এখন সংকটময়। তবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলছে, অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি ও রণতরীগুলো আমাদের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য হলেও সেগুলো এখন আমাদের জন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখানে মার্কিনিদের অবস্থান অনেকটা দুই পাটি দাঁতের মাঝখানে মাংসের মতো। নড়লেই সঙ্গে সঙ্গে চিবিয়ে খেয়ে ফেলব। এদিকে, এই পরিস্থিতির মধ্যেই পারস্য উপসাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) উপকূলের কাছে তাদের দুটি তেলের ট্যাঙ্কার ‘অন্তর্ঘাতমূলক হামলার শিকার’ হয়েছে। গত রোববার ফুজাইরা বন্দরের কাছে এ হামলায় সৌদি নৌযান দুটির ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। এটাকে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি বলে মনে করা হচ্ছে।

সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহ বলেন, ফুজাইরাহ বন্দরের কাছাকাছি ওই হামলায় জাহাজগুলোর ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে হতাহতের তথ্য জানা যায়নি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, হামলার এই ঘটনা ‘উদ্বেগজনক এবং ভীতিকর’ এবং এর পূর্ণ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার নজিরবিহীন চাপের মুখে আছে বলেও তিনি জানান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে রুহানি এ কথা বললেন। দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়া রুহানি নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।

রাজধানী তেহরানে রাজনৈতিক কর্মীদের রুহানি বলেন, যুদ্ধের সময় আমাদের ব্যাংকগুলোতে, তেল বিক্রিতে কিংবা আমদানি-রফতানিতে কোনো সমস্যা ছিল না। কেবল অস্ত্র কেনায় নিষেধাজ্ঞা ছিল।

রুহানি বলেন, শত্রুদের সৃষ্টি করা এই চাপ আমাদের ইসলামিক বিপ্লবের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক যুদ্ধ। কিন্তু আমি আশা ছাড়ছি না এবং ভবিষ্যতের জন্য আমি অনেক আশাবদী। আমি বিশ্বাস করি আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে এই কঠিন সময় পেরিয়ে যেতে পারব।

এরই মধ্যে কাতারের আল উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি বি-৫২ বোমারুবিমান পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের সম্ভাব্য হামলার হুমকি মোকাবিলায় এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তেহরানের কাছ থেকে হুমকির মাত্রা সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু বলেননি মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌ ফ্লিটকে ধ্বংস করে দেওয়া যাবে।

দেশটির একজন সিনিয়র ধর্মীয় নেতা ইউসেফ তাবাতাবাই নেজাদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ফ্লিটকে ধ্বংস করে দিতে পারে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র। এর আগে গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন হলো একটি সুস্পষ্ট ও যথার্থ বার্তা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য। এর অর্থ হলো ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে যেকোনো হামলার জবাব হবে ভয়াবহ।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি করে। কিন্তু গত বছর একতরফাভাবে সেই চুক্তি প্রত্যাহার করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই চুক্তির অধীনে ইরান তার স্পর্শকাতর পারমাণবিক কর্মকা- সীমিত করতে রাজি হয়। তা পরীক্ষা করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমতি দেয়। বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই চুক্তি প্রত্যাহার করে অবরোধ আরোপ করেন। শুরু হয় নতুন করে উত্তেজনা। সম্প্রতি ইরান ঘোষণা দিয়েছে তারা ওই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত স্থগিত করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করে যাবে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হবে তাদের অভ্যন্তরীণ কাজের জন্য। সেটা হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও জার্মানির সঙ্গে ইরান চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসর পর থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা শুরু করেন। গত বছরের ৮ মে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন তিনি। এর ঠিক এক বছর পর গত বুধবার ইরান চুক্তি থেকে আংশিক বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

ইরানের ওই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির ধাতবশিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানে তেলের পর রফতানির দ্বিতীয় বৃহত্তর খাত হলো এই শিল্প।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের লোহা, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কপার শিল্পের ওপর প্রভাব পড়বে। ট্রাম্প বলেন, ইরান তার আচরণে মৌলিক পরিবর্তন না আনলে আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।

চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদার ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গাও ফেং বলেন, ইরানের তেল বিক্রিতে লাগাম টেনে ধরলে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।

এদিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে ইরানের হুমকি প্রসঙ্গে ইইউর পররাষ্ট্র কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ফ্রেডেরিকা মোঘেরিনি এবং যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তারা বলেন, ‘ইরান পারমাণবিক চুক্তিতে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আমরা পর্যালোচনা করব।’

 

"