রেস্তোরাঁ থেকে সুপারশপ সর্বত্রই ভেজাল খাদ্য

জনবল সংকটে হয় না বাজার মনিটরিং

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০

মুহাজিরুল ইসলাম রাহাত, সিলেট

রমজান মাসকে ঘিরে ভেজাল বিষের খাদ্যপণ্যে সয়লাব সিলেট নগর। সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও ভেজাল খাদ্যপণ্যের উৎপাদনকারী, বাজারজাতকারী ও ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। থামানো যাচ্ছে না তাদের এ আগ্রাসন। রমজান মাস ঘিরে এ তৎপরতা যেন আরো বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইফতারির শরবত, খেজুরেও রয়েছে ভেজাল। দুধ-কলা, মাছেও রয়েছে ভেজাল ও বিষ। বাদ যাচ্ছে না ফল-মূল। আপেল, কমলা, আঙ্গুর, বেদানা, নাশপাতি, পাকা পেঁপে, বেল, আনারস, তরমুজসহ সব ফলে মেশানো হচ্ছে ফরমালিন, কার্বাইড এবং রাইপেন নামের বিষাক্ত কেমিক্যাল।

এছাড়া ইফতারের অপরিহার্য পাঁচটি সামগ্রী ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি ও জিলাপির প্রতিটিতেই নানাভাবে মেশানো হয় ভেজাল। বেগুনি, পেঁয়াজু, চপ কিংবা জিলাপিতে ব্যবহৃত হচ্ছে টেক্সটাইল কালার। কম খরচে বেশি লাভের আশায় একশ্রেণির বিক্রেতা এসব বিষাক্ত রং ব্যবহার করছেন ইফতার সামগ্রীতে। মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ভেজাল চিনি। এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম সাইক্লামেট। খাবারকে অধিকতর মিষ্টি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে স্যাকারিন, সুকরালেস ইত্যাদি। ইফতারে রোজাদারদের খুব পছন্দ ফল কিংবা এর জুস। কিন্তু বাজারের প্রায় সব ধরনের ফলে মেশানো হচ্ছে রাসায়নিক। জিলাপি দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখতে তেলের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে গাড়ির পোড়া লুব্রিকেন্ট। অন্যদিকে ফরমালিন-মিশ্রিত বিভিন্ন ফল, মাছ, সবজি বিক্রি চলছে বরাবরের মতো। নগরের নামিদামি রেস্তোরাঁ, সুপারশপ, সুইটশপ থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার। প্রতি বছর রমজান মাস এলেই বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা হোটেল-রেস্তোরাঁ, ইফতারি বিক্রেতাদের দোকানে অভিযান চালাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সেসব অভিযান-জরিমানার জাল কেবল ক্ষুদ্রও মাঝারি হোটেল-রেস্তোরাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

রমজান মাস ও ঈদকে টার্গেট করে বেশি মুনাফার আশায় নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি পণ্যেই ভেজাল করছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। কিছু দিন আগে সিলেটে র‌্যাব-৯ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের যৌথ অভিযানে এমন খাদ্য ভেজালের এক ভয়াবহ চিত্র ওঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায় মেয়াদোত্তীর্ণ, পচে-গলে যাওয়া খেজুরকে নতুন প্যাকেটে ঢুকিয়ে নতুন মেয়াদ দিয়ে বাজারে বিক্রি করছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এবার রমজান শুরুর আগেই পণ্যে ভেজাল না মেশাতে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয় সিলেটের প্রশাসন। তবুও ভেজাল পণ্য ব্যবসায়ীদের থামানো যাচ্ছে না।

গত সোমবার সিলেট নগরীর সুবিদবাজারে অ্যাগোরা সুপার শপে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। ওই সময় ভোজ্যতেলে মেয়াদের সিল না থাকায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই দিন সুপারশপ রিফাত অ্যান্ড কোংকে ভেজালের কারণে ৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ওই দিন দুপুরে নগরীর ভার্থখলা ও কদমতলী এলাকায় মুরগি ও মাংস বিক্রির পাঁচটি দোকানকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করে জেলা প্রশাসনের ভেজালবিরোধী টিম। পরের দিন মঙ্গলবার বিকালে সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার ফলবাজারে অভিযান চালায় র‌্যাব ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের টিম। অভিযানে দেখা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং পচে-গলে যাওয়া খেজুর প্যাকেট করে বিক্রি করছিল বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, আনিসা ফ্রুট এজেন্সি ও হাজী হানিফ এন্টারপ্রাইজ নামক তিনটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কাছ থেকে সাড়ে ১২ টন ভেজাল খেজুর জব্দ করে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া রাজমহলে মেয়াদোত্তীর্ণ কোমল পানীয় ও দই বিক্রির দায়ে ৫ হাজার টাকা এবং মধুবনে নোংরা জায়গায় মিষ্টি রাখায় ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এদিকে রমজান উপলক্ষে খাদ্যপণ্য ভেজাল ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে সিলেট জেলা প্রশাসন পাঁচটি টিম গঠন করেছে। তারা প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছে। এছাড়া সিলেট সিটি করপোরেশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং র‌্যাব-৯-এর পৃথক টিমও অভিযান চালাচ্ছে নগরীতে। কাজ করছে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পৃথক টিমও।

সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনা আক্তার বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় জরিমানার পরিমাণ কম হলেও পরবর্তী সময়ে ভেজাল পাওয়া গেলে বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদন্ড প্রদান করা হবে।

এদিকে খাদ্যপণ্যে ভেজাল তদারকি করা সংস্থা ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ অধিদফতর বলছে জনবল সংকটের কারণে তারা নিয়মিত বাজার তদারকি করতে পারছে না। এজন্য তাদের সহযোগী হয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সিলেট জেলা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, একজন সহকারী পরিচালক ও একজন অফিস সহকারী দিয়েই চলে পুরো জেলা নিয়ন্ত্রণের কাজ। মোট ১৩টি উপজেলার বাজারগুলো তদারকি করতে হয় একজন কর্মকর্তাকেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সিলেটের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রতিবেদককে জানান, ‘বাজার মনিটরিংয়ে আমরা অনেকটা অসহায়। পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় মাত্র দুইটি টিম দিয়ে পুরো জেলা নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। একটি জেলায় কমপক্ষে ১০টি টিম কাজ করা উচিত থাকলেও সেখানে কাজ করছে মাত্র দুইটি টিম। তিনি বলেন, ‘একটি জেলার জন্য কমপক্ষে একজন উপপরিচালক ও তিনজন সহকারী পরিচালকসহ সাতজন লোকের প্রয়োজন। এছাড়া তাদের যাতায়াতের জন্য নেই কোনো যানবাহন। পণ্যের মান পরীক্ষার জন্য নেই কোনো ল্যাব, সরঞ্জামাদি। কেবল লোকদেখানো হিসেবেই দায়িত্ব পালন করতে হয় সংশ্লিষ্টদের। এসব নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বার বার আবেদন করেও কোনো কাজ হয়নি বলে অভিযোগ এ কর্মকর্তার।

 

"