নুসরাত হত্যাকান্ড

কাদেরের কক্ষে হয় খুনের পরিকল্পনা

* জড়িত মাদ্রাসা কমিটির কয়েকজন

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ফেনী প্রতিনিধি

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা হয় হাফেজ আবদুল কাদেরের কক্ষে। এছাড়া তিনি ওই লোমহর্ষক হত্যার সময় গেট পাহারায় ছিলেন এবং পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি নিজেই নিজের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথাও স্বীকার করেছেন। হাফেজ কাদের এ মামলার প্রধান আসামি সিরাজ-উদ-দৌলার অন্যতম সহযোগী ও হেফজ বিভাগের প্রধান। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম বিভাগীয়

স্পেশাল এসপি মো. ইকবাল গণমাধ্যমকে হাফেজ আবদুল কাদেরের স্বীকারোক্তির তথ্য নিশ্চিত করেন। এদিকে নুসরাত হত্যাকান্ডে মাদরাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির কয়েকজন জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছেন পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রধান ডিআইজি এস এম রুহুল আমিন। আর নুসরাত জাহান রাফি হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এ দিনও ফেনীতে মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

দুই দিন মাঠ পর্যায়ে তদন্তের পর গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের তিনি আরো জানান, অভিযুক্ত অধ্যক্ষের অতীত ইতিহাস খারাপ থাকলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কমিটি যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় নুসরাত হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

এস এম রুহুল আমিন বলেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে মাদরাসার গভর্নিং বডির সদস্যও আছেন। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাছে তাদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে। ওসিরও ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মহিপাল সরকারি কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কলেজ ক্যাম্পাস থেকে মানববন্ধন বের করেন। মানববন্ধন মহিপাল মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন সেøাগান দিয়ে নুসরাত হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান। নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত তদারকিতে পুলিশ সদও দফতরের ডিআইজি রুহুল আমিনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ফেনীর এসপি ও সোনাগাজীর ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা তদন্ত করে নিয়ে প্রতিবেদন দেবে কমিটি।

এসপি মো. ইকবাল জানান, হাফেজ আবদুল কাদের আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন তিনি ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি হত্যাকারীদের নিরাপত্তায় মাদরাসার গেট পাহারায় ছিলেন এবং পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অন্যতম। নিজের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছেন। তার রুমেই হয়েছে পরিককল্পনা।

এর আগে এ মামলার আসামি নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম ও আবদুর রহিম শরীফের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে গত বুধবার সকালে ঢাকার হোসনি দালান এলাকা থেকে হাফেজ আবদুল কাদেরকে আটক করা হয়।

গত ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসায় আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারীরা। আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যান।

 

 

পুলিশের ভূমিকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত চায় টিআইবি : ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকান্ডে পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতি ও যোগসাজশের যে অভিযোগ উঠেছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নৃশংসতার মাত্রা এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তা অকল্পনীয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে দায়ী ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোরতম প্রয়োগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা আশা করি, তদন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং দোষী ব্যক্তিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। কিন্তু এই নৃশংস হত্যাকান্ডে (নুসরাত হত্যা) সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা ও যোগসাজশের যে অভিযোগ উঠেছে তাতে আমরা আতঙ্কিত। এরই মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পেরেছি, ওই পুলিশ কর্মকর্তা নুসরাতের অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে আমলে তো নেননি, বরং অভিযোগটির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি নুসরাতকে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পরও ওই পুলিশ কর্মকর্তা একে আত্মহত্যার চেষ্টা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মামলা নেওয়ার পরও ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে।

টিআইবি পরিচালক বলেন, এই রকম প্রতিটা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তথা সার্বিকভাবে পুলিশ প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এজন্য আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।

শুধু সংশ্লিষ্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়াটা কোনো শাস্তি হতে পারে না উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দোষীরা কেউ ছাড় পাবে নাÑ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসের যথাযথ বাস্তবায়ন দেখতে চায় দেশের মানুষ। এজন্য অনতিবিলম্বে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

"