বৈশাখী আহ্বান

‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন বছরে পুরোনো সব জীর্ণতা মুছে যাবেÑ এই প্রত্যাশা নিয়ে বঙ্গাব্দ ১৪২৬-কে বরণ করে নিল বাংলাদেশ। যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আগুনে ঝলসে প্রাণ হারানো নুসরাতের জন্য যখন ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ, সে সময় এই বর্ষবরণের কর্মসূচিতে এসেছে সব সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণের আহ্বান। এ আহ্বানকে কেন্দ্র করেই এবার পহেলা বৈশাখের প্রভাতী আয়োজন সাজিয়েছিল ছায়ানট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্যেও ছিল ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’Ñ অশুভকে বিনাশ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের বাণীতে কণ্ঠ মিলিয়ে বৈশাখের প্রথম দিন বাঙালির প্রত্যাশা থাকেÑ বৈশাখের রুদ্র ঝড় পুরোনো বছরের আবর্জনা উড়িয়ে নেবে, গ্রীষ্মের অগ্নিস্নানে সূচি হবে বিশ্ব ধরা। আর্থসামাজিক নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও সাম্প্রদায়িকত সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্য-অনাচার এখনো বড় সমস্যা। গেল সপ্তাহেই মারা গেছে ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি, নিজের প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় দেশজুড়ে নারী-শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদ চলতে থাকলেও এরইমধ্যে প্রতিদিনই ধর্ষণ-নিপীড়নের খবর আসছে।

ছায়ানট এবার বৈশাখ বরণ করে সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মনে শুভবোধের জাগরণের আহ্বানে। পহেলা বৈশাখে ভোর সোয়া ৬টায় বছরের প্রথম সূর্যোদয়কে ছায়ানট স্বাগত জানায় রাগালাপ দিয়ে। তাদের প্রভাতী আয়োজনের প্রত্যুষে ছিল প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের গুচ্ছ। পরের ভাগে ছিল অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী, গান-পাঠ-আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালোবাসার প্রত্যয়। শিক্ষার্থী-প্রাক্তনী-শিক্ষক নিয়ে ছোট বড় মিলিয়ে এবারের অনুষ্ঠানে সম্মেলক গান পরিবেশন করেন শ’ খানেক শিল্পী। অনুষ্ঠানে ছিল ১৩টি একক ও ১৩টি সম্মেলক গান এবং দুটি আবৃত্তি। ছায়ানটের আহ্বান অনুযায়ী রবীন্দ্র রচনা থেকে বেছে নেওয়া হয় আবৃত্তি দুটি।

গানগুলো নির্বাচন করা হয় কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, লালন শাহ, মুকুন্দ দাস, অজয় ভট্টাচার্য, শাহ আবদুল করিম, কুটি মনসুর, সলিল চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে।

নববর্ষের সাড়ে ৮টায় পুরো ঢাবি এলাকা যেন জনসমুদ্র। মানুষের কোলাহল, হর্ষধ্বনি, গান ও ঢাকঢোল মিলে যে ঐকতানের সৃষ্টি হয়, তাতে মুখর হয়ে ওঠে চারুকলা চত্বর। ৯টায় শুরু হয় আনন্দযজ্ঞ, মঙ্গল শোভাযাত্রা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মিলনমেলা। ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’ সেøাগানে ১৪২৬ সনের বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়।

শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন ঢাবির উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান। শোভাযাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন স্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। কঠোর নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো হয় পুরো এলাকা। শোভাযাত্রায় নিয়ে নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকলেও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের কাছে হার মানে সবকিছুই। ঢাক-ঢোলের বাদ্যি আর তালে তালে তরুণ-তরুণীদের নৃত্য, হইহুল্লোড় আর আনন্দ-উল্লাস মাতিয়ে রেখেছেন পুরো শোভাযাত্রা।

চারুকলা ও ছবির হাটের মধ্যবর্তী জায়গা থেকে এগিয়ে যায় শোভাযাত্রা। সামনেই ছিল মূল শিল্পকাঠামোগুলো। এবার শোভাযাত্রার শিল্পকাঠামোগুলোর মূলটিতে বাঘের মুখ থেকে কাঁটা তোলার চিরায়ত গল্পটি উপস্থাপিত হয় বাঘ ও বকের অনুষঙ্গে। মঙ্গলের বার্তা নিয়ে ছিল প্যাঁচা। সমৃদ্ধির কথা বলছে ছাগল আর সিংহের সমন্বয়ের বিশেষ মোটিভ। লোকজ ঐতিহ্যের চিত্র মেলে ধরে গাজীর পটের গাছ। এছাড়া অনুষঙ্গের মধ্যে ছিল দুই মাথা ঘোড়া, দুই পাখি, কাঠঠোকরা, পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় সওয়ার মানুষ। আগে–পিছে জনস্রোত। বিচিত্র, বর্ণিল, সর্পিল ঢেউ যেন। মানুষের হাতে রংবেরঙের পাখা, সরাচিত্র, বাদুড়, টিয়াসহ নানা জাতের পাখি। মুখে নানা আকৃতির মুখোশ। হর্ষধ্বনি দিয়ে এগিয়ে চলে শোভাযাত্রা। দ্রিম দ্রিম ঢোলের শব্দ। নব প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে যায় দিগ?বিদিক। গলা ছেড়ে ধরে গান, ‘এসো হে বৈশাখ’।

শোভাযাত্রার পুরো পথে সিসিটিভি ক্যামেরা আর পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। পথিমধ্যে কেউ মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পারেনি। কারণ চতুর্দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে মানবশিল্ড গঠন করা হয়েছে। গতবারের মতো এবারও ছিল মুখোশ ব্যবহার নিষিদ্ধ। ভুভুজেলা নিষিদ্ধ ছিল। নিরাপত্তার জন্য রমনা পার্ক, ঢাবিসহ আশপাশের এলাকায় কেন্দ্রীয় রাস্তা বন্ধ ছিল শোভাযাত্রার জন্য। শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় থেকে ঢাকা ক্লাব ও শিশুপার্কের সামনে দিয়ে ঘুরে টিএসসি যায়। চারুকলার সামনে এসে শেষ হয় যাত্রা।

এদিকে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরান ঢাকার সব শ্রেণির মানুষই পহেলা বৈশাখের আমেজে মেতে উঠে। তারা ঘুম থেকে উঠে যার যার মতো নতুন পোশাক পরিধান করে। আগে থেকেই সকালের পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ প্রস্তুত করে রাখে। তারপর মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। বাজারের সব দেনা-পাওনা পরিশোধ করে হরেক রকমের মিষ্টি মেটায় নিয়ে বাড়িতে ফেরে। বিকালে তারা বৈশাখী মেলায় ঘুরতে যান।

এভাবেই বাঙালির সবচেয়ে প্রাণের উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’ উদযাপন করে আসছে পুরান ঢাকার বসবাসরত সব মানুষ। এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। প্রতিবারের মতো এবারও পুরান ঢাকায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয়েছে বাংলা নববর্ষ-১৪২৬।

সরেজমিন দেখা যায়, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাঁখারিবাজার ও তাঁতীবাজারের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করে তুলেছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নতুন করে রঙ করা হচ্ছে। আর ব্যবসায়ীরা ফুল দিয়ে দোকান সাজিয়ে হালখাতা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আর তাদের খরিদ্দাররা বকেয়া পরিশোধ করেন।

পুরান ঢাকার প্রাচীনতম মেলার মধ্যে প্রথমে গেন্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠের মেলার কথাই চলে আসে। এখনো পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ধূপখোলা মাঠে প্রতি বছরের মতো এবারও বৈশাখী মেলা হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন দোকানের স্টল বসেছে। মেয়েদের সব ধরনের কসমেটিকস সামগ্রী পাওয়া যায়। যার কারণে মেয়ে ক্রেতাদের মেলার প্রতি আলাদা আকর্ষণ দেখা যায়।

"