নুসরাত হত্যাকান্ড

নূর ও শামীমের দোষ স্বীকার

* ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা * ৫ দিনের রিমান্ডে মাকসুদ

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

আদালত প্রতিবেদক ও ফেনী প্রতিনিধি

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় ‘সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে’ আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে এজাহারভুক্ত দুই আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। গত রোববার মধ্যরাতে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাহেরুল হক চৌহান। এদিকে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাকসুদ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সোমবার দুপুরে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহমদ এ আদেশ দেন। এদিকে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়েছে। একই দিন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন এ মামলা করেন। যৌন নিপীড়কদের আগুনে নিহত ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ‘স্টেটমেন্টের’ ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে এ মামলা করা হয়। এর আগে যথাযথ সহায়তা পাননি বলে নুসরাতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১০ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

তাহেরুল হক চৌহান বলেন, নূর ও শামীমকে আদালতে হাজির করা হয় রোববার বিকাল ৩টায়। এরপর তাদের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু করেন বিচারক, তা চলে রাত ১টা পর্যন্ত। আদালত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জবানবন্দি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। আসামি দুজন আদালতের কাছে তাদের স্বীকারোক্তি উপস্থাপন করেন। সেখানে তারা পুরো ঘটনা স্পষ্ট করেছেন জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তারা কারাগারে থাকা মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার কাছ থেকে হুকুম পেয়ে হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে। এ সময় তাদের সঙ্গে কারা ছিল, কীভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, বিষয়গুলো জবানবন্দিতে এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা এখনই গণমাধ্যমকে জানানো হচ্ছে না।

আর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম জানান, মাকসুদ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ১০ দিনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। বিচারক পাঁচ দিনের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। মাকসুদ আলমকে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় গ্রেফতার করা হয়। এ নিয়ে এ মামলার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ জনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

নুসরাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয় আসামি ছাড়াও আরো সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে ৯ এপ্রিল জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালত নূর হোসেন, কেফায়াত উল্যাহ, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শহিদুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন। ১০ এপ্রিল অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে সাত দিন এবং আবছার উদ্দিন ও আরিফুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন একই আদালতের বিচারক। পরের দিন ১১ এপ্রিল উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের হোসেনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ১৩ এপ্রিল জাবেদ হোসেনকে সাত দিনের রিমান্ড দেন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইন।

যৌন হয়রানি মামলার বিবরণ অনুসারে, যৌন হয়রানির অভিযোগে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে মামলার পরে গত ২৭ এপ্রিল নুসরাতকে থানায় ডাকেন ?তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম।

থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় ঘটনা নিয়ে (যৌন হয়রানি) নুসরাতকে আপত্তিকর ও অসহনীয় প্রশ্ন করেন। যা পরবর্তী সময়ে ওসি তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। এর আগে ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আর ওই মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত।

"