নুসরাত হত্যাকাণ্ড

জেলে বসেই খুনের নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ সিরাজ!

* কিলিং মিশনে বোরকা পরা চারজনের তিনজনই পুরুষ * পরিকল্পনায় দুই নারীসহ ১৩ জন

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে জেলে বসেই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। হত্যাকা-ের সঙ্গে দুই নারীসহ ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আর নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়েছিল বোরকা পরা চারজন। এদের মধ্যে তিনজনই ছিলেন পুরুষ! তাদের একজন হচ্ছেন গ্রেফতার হওয়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীম। তদন্তের স্বার্থে কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেওয়া বাকি দুজন পুরুষ ও নারীর পরিচয় দেয়নি তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই। নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়ে মাদরাসার মূল গেট দিয়েই পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। তিনি জানান, নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগ করে হত্যার ঘটনার সঙ্গে ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মামলার এজাহাভুক্ত সাতজন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নুসরাতের গায়ে সরাসরি আগুন দেয় যে চারজন তার মধ্যে এক নারীসহ দুজনকে চিহ্নিত করা গেছে। হত্যাকা-ে জড়িত বাকিদের গ্রেফতারে অভিযানে আছে পিবিআই। পুরো ঘটনায় দুই নারীর সম্পৃক্ততা পেয়েছে পিবিআই।

এরই মধ্যে গ্রেফতার হওয়া এজাহারভুক্ত সাতজন হলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৫), মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন (২০) ও শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৪৫), জোবায়ের আহম্মেদ (২০), জাবেদ হোসেন (১৯) এবং আফসার উদ্দিন (৩৫)। এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদের এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। বাকি পাঁচজনকে গ্রেফতারেও অভিযান চলছে। এদিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার হওয়া ছয়জন হলেন কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা পপি, নূর হোসেন ও আলাউদ্দিন।

জেলে বসেই খুনের পরিকল্পনা : গায়ে আগুন দেওয়ার দুই দিন আগে অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে কারাগারে গিয়ে দেখা করে নুসরাতের খুনিরা। হত্যাকা-ের দুই দিন আগে ৪ এপ্রিল ওই মাদ্রাসার ছাত্র শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ যারা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার মুক্তির পক্ষে ছিলেন তাদের মধ্যে নূরউদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীমসহ কয়েকজন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেয়। স্মারকলিপি দিয়ে ওই দিনই কারাগারে সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে দেখা করে তারা। এ সময় কারাবন্দি অধ্যক্ষ সিরাজের কাছ থেকে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশনা নিয়ে এসে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। কীভাবে হত্যা করা হবে পরে নূরউদ্দিন ও শামীমের নেতৃত্বে তার বিশদ পরিকল্পনা করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার আগে অনেক কাহিনী আছে। সবকিছু তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে বলা ঠিক হবে না। তিনি আরো বলেন, মাদ্রাসার পাশে একটি হোস্টেলেই ছিলেন নূরউদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন। জেল থেকে নির্দেশনা নিয়ে এসে ৫ এপ্রিল তারা নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনার বিষয়টি পরে আরো পাঁচজনের সঙ্গে শেয়ার করে তারা। তাদের মধ্যে ওই মাদ্রাসারই দুই ছাত্রীও আছে। একজনকে তিনটা বোরকা ও কেরোসিন আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই ছাত্রী বোরকা ও কেরোসিন শামীমের কাছে দেয়। এরপর ৬ এপ্রিল তারা কিলিং মিশনে অংশ নিয়ে নুসরাতের শরীরে আগুন দেয়। পরে সেখান থেকে তারা নির্বিঘেœ পালিয়ে যায়।

পিবিআইয়ের ডিআইজি আরো জানান, দুই কারণে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করে নুসরাত আলেম সমাজকে হেয় করেছে বলে মনে করে তারা। আরেকটি কারণ হলো শামীম দীর্ঘদিন ধরে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। নুসরাত তা বারবারই প্রত্যাখ্যান করছিল। এই ক্ষোভ থেকে শামীম তাকে পুড়িয়ে হত্যার প্রস্তাব দেয়। দুই কারণ মিলিয়ে নুসরাতকে গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

তিনি জানান, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে থেকেই ওই মাদ্রাসায় লুকিয়ে ছিল হত্যাকারীরা। সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে দুটি টয়লেটে লুকিয়ে ছিল তারা। চম্পা নামের একটি মেয়ে পরীক্ষার হলে গিয়ে নুসরাতকে বলে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। এই কথা শুনে নুসরাত দৌড়ে ছাদে যায়। এরপর তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। হত্যাকা-ে অংশ নেওয়া চারজন এবং নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে আসা চম্পা ঘটনার পর সবার সামনে দিয়েই পালিয়ে যায়। নূরউদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন আগে থেকেই গেটে পাহারা দিচ্ছিল। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সবাই গা ঢাকা দেয়।

গত ৬ এপ্রিল নুসরাতকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে তার শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাত ১০ এপ্রিল মারা যান। এর আগে ৮ এপ্রিল নুসরাত জাহান রাফি ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ (মৃত্যুশয্যায় দেওয়া বক্তব্য) দেন। নুসরাত তার বক্তব্যে বলেছেন, ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে তার শরীরে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ওড়না পুড়ে গেলে তার হাত মুক্ত হয়। বোরকা, নেকাব ও হাতমোজা পরা যে চার নারী তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন, তাদের একজনের নাম চম্পা বলেও জানান তিনি।

নুসরাতের স্বজনরা বলেন, গত ২৭ মার্চ তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা নুসরাতকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। ওই ঘটনায় থানায় মামলা করেন তার মা। ওই মামলায় অধ্যক্ষ কারাগারে যান। মামলা তুলে নিতে অধ্যক্ষের লোকজন হুমকি দিয়ে আসছিল। মামলা তুলে না নেওয়াতেই ক্ষিপ্ত হয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় নুসরাতকে।

 

"