পহেলা বৈশাখ : স্বাগত ১৪২৬

জেগে ওঠো প্রাণের উৎসবে

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

‘তাপসনিঃশ্বাসবায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি/অশ্রুবাষ্প সুদূরে মেলাক।’ হ্যাঁ, সেই সুদূরেই মিলিয়েছে আরো একটি বছর। হারিয়েছে কালের গর্ভে। শুদ্ধ সুন্দর এ প্রার্থনার মধ্যদিয়ে আজ নতুন করে দিন শুরু করবে বাঙালি। পুরোনো শোক-তাপ-বেদনা-অপ্রাপ্তি-আক্ষেপ ভুলে অপার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করবে। দুই হাতে অন্ধকার ঠেলে, ভয়কে জয় করার মানসে জেগে উঠবে। আজ রোববার অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক জাগরণের পহেলা বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন-বাঙালির প্রাণের উৎসবের দিন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আজ একাত্ম হয়ে গাইবেনÑ ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ...।’ আনন্দে উৎসবে মাতবে গোটা দেশ। কবিগুরুর ভাষায়, ‘নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে/শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে...।’ একই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নজরুল লিখেছেন, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর...।’

সেই জয়ধ্বনিতেই নতুন বছরকে বরণ করে নেবে বাঙালি। নতুন স্বপ্ন বুনবে কৃষক। হালখাতা খুলবেন ব্যবসায়ীরা। নববর্ষ বরণে রাজধানীসহ সারা দেশে একযোগে চলবে লোকজ ঐতিহ্যের নানা উৎসব। আজ ছুটির দিন। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে নববর্ষের বিশেষ সংখ্যা। টেলিভিশন-রেডিওতে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎসব উল্লেখ করে অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেছেন, বাংলা নববর্ষে মহামিলনের আনন্দ উৎসব থেকেই বাঙালি ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে কুসংস্কার ও কুপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা পায়, জাতি হয় ঐক্যবদ্ধ।

তিনি বলেন, নতুন বছর মানেই এক নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশায় পথ চলা। বুকভরা তেমনি প্রত্যাশা নিয়ে নতুন উদ্যমে ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতি কাল আরো সোচ্চার হবে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মৌলবাদ ও জঙ্গি নিধনের দাবিতে।

এদিকে আবহমানকালের বাঙালি ঐতিহ্যের বরণডালা সাজিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বিপুল আয়োজন দেশজুড়েই। রাজধানীতে রীতিমতো সাজ সাজ রব। চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনের ব্যস্ততা, শিশু একাডেমির সামনে মৃৎ ও কারুশিল্পের দোকানগুলোতে কেনাকাটার ধুম। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চৈত্রসংক্রান্তির আসর, বৈশাখ বরণ অনুষ্ঠানের মহড়া।

মঙ্গল শোভাযাত্রা : বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা ৩০ বছরপূর্তি হবে এ বছর। ১৯৮৯ সালে সামরিক স্বৈরশাসনের হতাশার দিনগুলোতে তরুণরা এটা শুরু করেছিলেন। তারপর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এ শোভাযাত্রা বের হয়। এ বছরের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে- ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’।

আয়োজকরা বলছেন, এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার পুরোভাগে থাকবে মহিষ, পাখি ও ছানা, হাতি, মাছ, বক, জাল ও জেলে, ট্যাপা পুতুল, মা ও শিশু এবং গরুর আটটি শিল্প কাঠামো। এছাড়াও রয়েছে পেইন্টিং, মাটির তৈরি সরা, মুখোশ, রাজা-রানির মুখোশ, সূর্য, ভট, লকেট ইত্যাদি।

এছাড়া বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানকে ঘিরে নাশকতার কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল রাজধানীর রমনা বটমূলে বর্ষবরণ আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের তিনি একথা জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে নাশকতার কোনো আশঙ্কা নেই। এছাড়া গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। নববর্ষ উদযাপনে কেউ কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।

পহেলা বৈশাখ এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা দেশের মানুষ যাতে সুন্দরভাবে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ যেন উসকানিমূলক বার্তা ও গুজব ছড়াতে না পারে সেজন্য সাইবার নিরাপত্তা দলের নজরদারি রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

চাই পান্তা-ইলিশ : পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের খুব সম্পর্ক নেই; ছিল না। কিন্তু তাতে কী? রাজধানী শহরে পহেলা বৈশাখ মানেই যেন পান্তা-ইলিশ। শুঁটকি ভর্তা, আচার ইত্যাদি দিয়ে মজা করে খাওয়া হবে আজ। ঘরে, বিভিন্ন মেলায়, উৎসবে আয়োজন থাকবে পান্তা-ইলিশ। তবে দাম বেশি, অগ্নিমূল্য, করেই অসাধু ব্যবসায়ীর কারাসাজিতে বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় ইলিশ।

গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশের সরবরাহ থাকলেও সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে অনেকটা ইচ্ছামতো হাঁকা হচ্ছে ইলিশের দাম। তবে দাম বেশি হলেও ক্রেতারাও থেমে নেই। বেশি দাম দিয়েই কিনছেন ইলিশ। বাজারে প্রতিটি ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। যা সপ্তাহখানেক আগে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। প্রতি পিস ৯০০ থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম হাঁকানো হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। বাজারে সামান্য পরিমাণ বড় সাইজের ইলিশ থাকলেও দাম হাঁকানো হচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা।

শুভ হালখাতা : চৈত্রের শেষ দিনে গতকাল ব্যবসায়ীরা পুরোনো বছরের বিকিকিনির সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছেন। আজ পহেলা বৈশাখে তারা হালখাতা খুলবেন। নবোদ্যমে শুরু করবেন ব্যবসা। ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঢাকায় এখনো হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে স্বর্ণকার ও কাপড় ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়মিত ক্রেতাদের আগে থেকেই গ্রিটিংস কার্ডের মাধ্যমে নিমন্ত্রণ জানান। আজ দোকানে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করবেন তারা। পুরোনো পাওনা শোধ করে নতুন খাতায় হিসাব খুলবেন ক্রেতারা।

 

"