বৈশাখময় দেশ

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

জিয়াউদ্দিন রাজু

আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে নতুন বঙ্গাব্দ। বাংলা পঞ্জিকায় যোগ হবে নতুন একটি বছর। আগামীকাল বাংলা ১৪২৬ সালের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। নতুন বছর বরণ করে নিতে বাঙালি মেতে উঠবে প্রাণের উৎসবে। ভোর থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিকতা, চলবে দিনভর। বর্ষবরণে প্রস্তুত রাজধানীসহ সারা দেশে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউট, ফ্যাশন হাউস, রেস্তোরাঁ, মৃৎশিল্পের দোকান, শিশুপার্কসহ বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র। চারদিকে উৎসবের আমেজ, সাজ সাজ রব, বৈশাখময় বাংলাদেশ।

বর্ষবরণে দেশের সবচেয়ে বড় আয়োজনটা থাকে রমনা বটমূলে। সেখানে বৈশাখের আবাহনে শুরু হবে ছায়ানটের অনুষ্ঠান। রমনা বটমূলে ছায়ানটের টানা ৫২তম অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ তৈরির কাজ প্রায় শেষ। রোববার ভোরে সুরে সুরে নতুন বছরের প্রথম দিনটিকে সম্ভাষণ জানানো হবে এখানে। এতে উপস্থিত থাকবেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো নারী-পুরুষ। এ ছাড়া সকাল ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার তত্ত্বাবধানে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড়, শিশু একাডেমি দিয়ে ঘুরে টিএসসি চত্বর দিয়ে আবার চারুকলায় গিয়ে শেষ হবে।

‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’Ñ এ আহ্বান নিয়ে সাজানো হয়েছে রমনার বটমূলের প্রভাতি আয়োজন। ভোর সোয়া ৬টায় বছরের প্রথম সূর্যোদয়কে স্বাগত জানানো হবে রাগালাপ দিয়ে। প্রত্যুষে থাকছে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের গুচ্ছ। পরের ভাগে থাকছে অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী, গান-পাঠ-আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালোবাসার প্রত্যয়। ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে গতকাল সকালে হয়েছে অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত মহড়া। আজ সকালে হবে রমনা উদ্যানের বৈশাখী চত্বরে মঞ্চ মহড়া।

নতুন বছর বরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক-প্রাইভেট ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে নানা আয়োজন। রং-বেরঙের ফানুস, মুখোশসহ বিভিন্ন প্রতিকৃতি তৈরিতে ব্যস্ত জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ও খুলনায় বিভিন্ন স্থানে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলা নববর্ষ জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ‘বাঁচলে নদী বাঁচবে দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’Ñ এ স্লোগান নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা সকাল সাড়ে ৯টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে। শোভাযাত্রায় মুখোশের পরিবর্তে মাছের প্রতিকৃতি তুলে ধরা হবে। এ ছাড়াও শুশুক, বজরা, ডিঙ্গি, ময়ূরপঙ্খী নৌকা, নৌকাবাইচের প্রতিকৃতি স্থান পাবে।

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকছে লোকজ ট্টাটু ঘোড়া, পাখি ও গরুর গাড়ি। মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষে থাকছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য লোকজ মেলার আয়োজন। একই সঙ্গে ‘নন্দিত স্বদেশ, নন্দিত বৈশাখ’ প্রতিপাদ্যে এবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উদযাপিত হবে বাংলা নববর্ষ।

কেনাকাটায় বৈশাখ : বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারা দেশেই ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে কেনাকাটা। ঢাকার ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় শপিং মল সেজেছে বৈশাখী সাজে। নতুন আর ভিন্ন ডিজাইনে পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। এসব পোশাকে উঠে এসেছে গ্রামীণ বাংলার রূপবৈচিত্র। এসব পোশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হাতি, ঘোড়া, প্যাঁচা, ঘুড়িসহ নানা উপকরণ। পরিবারের জন্য রয়েছে ফ্যামিলি প্যাকেজও। ব্যবসায়ী জানান, ফ্যামিলি প্যাকেজ, যেটা বাচ্চা থেকে শুরু করে বাবা-মাসহ সবাই মিলে পরতে পারবে এ ধরনের। এগুলোর ওপর আমরা প্রাধান্য দিয়ে থাকি।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নানা রঙের নতুন পোশাকে বৈশাখ আয়োজনে পরিবার-পরিজনসহ কেনাকাটায় ভিড় করছে নগরবাসী। অনেকে ঘুরেফিরে দেখছেন, আবার অনেকে কিনে ফিরছেন পছন্দের পোশাক। এর পাশাপাশি অনলাইন শপেও বৈশাখের কেনাকাটায় মেতেছে নগরবাসী। ঘরে বসে অনলাইনে এক ক্লিকেই নিজেদের পছন্দমতো বৈশাখী পণ্য কিনছেন তারা। আর এই উৎসবকেন্দ্রিক বিক্রির টার্গেট পূরণে বিভিন্ন ধরনের ছাড়ও দিচ্ছেন ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা। পোশাকের পরে নারীদের আগ্রহ দেখা যায় জুয়েলারির দিকে। এবার এমেটি সোনা এবং অ্যান্টিক ডিজাইনের গহনার প্রতি নারীদের বেশি আগ্রহ বলে জানিয়েছেন মলের জুয়েলারি বিক্রেতারা।

ইলিশের বাজার : পান্তা-ইলিশ বাঙালির বৈশাখের নতুন সংযোজন। তাই বৈখাশের আমেজটা বেশ লক্ষ করা যাচ্ছে ইলিশে। তবে বাজারে বৈশাখী ইলিশের দাম চড়া। নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাজারে এক কেজির কিছু বেশি ওজনের একটি ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। যা সপ্তাহখানেক আগেও দেড় হাজার টাকার কাছাকাছি ছিল। নববর্ষের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ বাড়ছে রুপালি ইলিশের।

মেলা বসবে : প্রতি বছরের মতো এবারও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এর মধ্যে বৈশাখী মেলা স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকাসহ রাজধানীর বেইলি রোড, মিরপুর, ধানমন্ডি, দোয়েল চত্বর, শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে হবে বৈশাখী মেলা। বৈশাখজুড়ে চলবে এসব মেলা।

এদিকে চট্টগ্রামে বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে চলছে বিভিন্ন সংগঠনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এ ছাড়া রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লাসহ সব বিভাগীয় ও জেলায় নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে উদযাপিত হবে পহেলা বৈশাখ।

 

"