এবার রুট পাল্টে আসছে ইয়াবা

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

নতুন কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন রুট ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে আনা মরণনেশা ইয়াবা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই ইয়াবা কারবারিরা। বরং নতুন রুট তৈরি করে মাদক আনা হচ্ছে দেশে। কিছুদিন আগেও টেকনাফ দিয়ে ইয়াবার চালানগুলো ঢুকেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির পর সে রুটে মাদক চোরাচালান অনেকটাই কমেছে। তবে পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন রুট ও কৌশল পাল্টে ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে দেশে। সিলেটের জকিগঞ্জ ও বান্দরবানের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি এখন পাচারকারীদের নতুন রুট। আবার মাদক পাচারের কৌশল হিসেবে নারীদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি বেসরকারি বিভিন্ন হেলিকপ্টারে করে ইয়াবা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। এমন তথ্যে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা কারবারির মধ্যে যারা গডফাদার ছিল তাদের বেশির ভাগই পলাতক রয়েছেন। সম্প্রতি ১০২ গডফাদার পুলিশের সেফ হোমে যাওয়ার পর থেকে নতুন রুট খুঁজতে শুরু করে ইয়াবা কারবারিরা। যারা আত্মসমর্পণ করেছে তারা প্রায় সবাই টেকনাফের কারবারি। কিন্তু উখিয়া ও কক্সবাজারের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারাই অর্থলগ্নি করে ইয়াবা ব্যবসা সচল রেখেছে। এ জন্য রোহিঙ্গা ও জেলেদের বেছে নেওয়া হচ্ছে। তারাই আয়েশি জীবনের আশায় দেশে ইয়াবা আনছে। ফলে বর্তমানে যারা ইয়াবা ব্যবসা করছে তাদের বেশির ভাগেরই নাম জানে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, টেকনাফের পর উখিয়া উপজেলার থাইংখালী রহমতের বিল, পালংখালী, বালুখালী এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তমব্রু সীমান্তকে ইয়াবা পাচারের রুট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রপথে জেলেদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে ইয়াবার চালান। আগে শুধু নাফ নদী বেছে নিলেও বর্তমানে লাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকাসহ ১২ থেকে ১৫টি রুট বেছে নিয়েছে ইয়াবা কারবারিরা। সম্প্রতি ইয়াবার বড় যে চালানগুলো ধরা পড়েছে সেগুলোর বেশির ভাগই গভীর সমুদ্র দিয়ে আনা হয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পরে সুবিধা বুঝে এগুলো বিভিন্ন পন্থায় সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বশেষ অভিযানগুলোর দিকে তাকালেও স্পষ্ট হয় ইয়াবার রুট পরিবর্তনের একটি নতুন চিত্র।

এদিকে বিজিবির একটি সূত্র জানায়, মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় অন্তত ৫০টি ইয়াবার কারখানা রয়েছে। কারখানার মালিকরা ওখানকার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় ইয়াবার চালান পৌঁছে দিচ্ছে মাছ ধরার নৌকায়। মূলত গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার আড়ালে অদলবদল হয় ইয়াবা। হোয়াইকং থেকে শেমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার জেলে বাস করে। বর্তমানে এদেরই একটি অংশ বাহক হিসেবে কাজ করছে। তাদের সঙ্গে ভিড়েছে আশ্রিত রোহিঙ্গারাও।

জানা গেছে, অনলাইনে ইয়াবা কেনাবেচার এক নিরাপদ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অনলাইনে অর্ডার করলেই ঘরে চলে আসছে ইয়াবার চালান। চোরাকারবারিরা আবার ইয়াবা বহনে মানুষের পাকস্থলী ভাড়া করছে। টেকনাফ থেকে ঢাকায় একটি চালান পাচার করে দিলে পাকস্থলী ভাড়া হিসেবে একজনকে দেওয়া হয় ১০-১৫ হাজার টাকা। আর মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করেই পাকস্থলীর মধ্যে কারবারিদের ইয়াবা পাচার করে দিচ্ছে অনেকে। সম্প্রতি এক নারী পেটে ইয়াবা নিয়ে পাচার করতে গিয়ে মারা গেছেন। এর আগেও কয়েকজন মারা যান। এছাড়া কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের প্যাকেট, কার্টন ও কৌটার মধ্যে ইয়াবা আনা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম, টেকনাফ-কক্সবাজার থেকে রাজধানীতে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক আসার খবর নতুন নয়। সড়ক, রেল কিংবা নৌপথে মাদকের চালান এলেও বেশ কিছুদিন ধরে তা আসছে আকাশপথে। সড়ক, রেল ও নৌপথে মাদক পাচারের ক্ষেত্রে ট্রানজিট হিসেবে রাজধানীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত বছর মাদকবিরোধী অভিযানের পর সড়ক, রেল ও নৌপথে নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় কৌশল পাল্টেছে মাদক কারবারিরা। এখন আকাশপথে আসছে মাদক। সম্প্রতি আকাশপথে আসা বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও মাদকসহ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়ে অর্ধশত কারবারি।

বিমানবন্দরে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বিমানবন্দরে স্ক্যানার দিয়ে সহজেই ধরা পড়ে স্বর্ণ। কেউ স্বর্ণ নিয়ে আর সহজে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন না। কিন্তু মাদক ধরার ক্ষেত্রে স্ক্যানার কাজে আসছে না। কারণ ইয়াবা বা অন্য মাদক মেটাল জাতীয় পদার্থ নয়। ইয়াবা ধরার ক্ষেত্রে এক্স-রে কার্যকরী। সম্প্রতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ শাহরিয়ার পারভেজ, জাহাঙ্গীর, নেপাল পাল ও হাবিব নামে চার মাদক কারবারিকে আটক করে র‌্যাব।

জানা গেছে, মাদক আসছে কক্সবাজার চট্টগ্রাম থেকে ডোমেস্টিক ফ্লাইটে। আর ডোমেস্টিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইন্টারন্যাশনাল মানের নজরদারি নেই। এছাড়া হাত বা ব্যাগেও নয় মাদক কারবারিরা মাদক আনার ক্ষেত্রে পাকস্থলী ও গোপনাঙ্গ ব্যবহার করছে। যা এক্স-রে মেশিন ছাড়া ধরা সম্ভব নয়। বিমানবন্দরে শরীরের ভেতরে বহন করা মাদক শনাক্তের প্রযুক্তি না থাকায় এ পথকে বেছে নিয়েছে মাদক চক্র। সীমাবদ্ধতার পরও শুধু গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ও সন্দেহভাজনদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রয়োজনে হাসপাতালে এক্স-রে করে মাদকের আলামত চেক করা হয়। এভাবেই অর্ধশতাধিক মাদক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি গোপনাঙ্গে ৭২০টি ইয়াবা আনার সময় আটক করা হয় এক নারীকে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্র¿ণ অধিদফতরের (ডিএনসি) সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম জানান, সত্যি উদ্বেগের বিষয় যে ইয়াবা আসছে আকাশপথে। বিমানবন্দরে মাদক ধরার জন্য প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই তা বাস্তবায়ন করা হবে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে ভারত হয়ে সিলেট সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা দেশে ঢুকছে। এই রুটের কথা আগে শোনা যায়নি। তবে চোরাকারবারিরা যত রুট ও কৌশলই অবলম্বন করুক, তাদের ধরে আইনের আওতায় আনবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, অভিযানে মাদক পাচার অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে কারবারিরা। গাঢাকা দিয়েছে অনেকে। মাদক ব্যবসায়ীরা যত দিন আছে, তত দিন সাঁড়াশি অভিযান চলবে। পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অভিযান চলছে। এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যক মাদক জব্দ করা হয়েছে। এটি ভালো অবস্থায় না আসা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

 

"