জানাজায় জনতার ঢল

দাদির পাশে চিরঘুমে শায়িত

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ফেনী প্রতিনিধি

দাদির কবরের পাশে চিরদিনের শুইয়ে রাখা হলো সোনাগাজীতে পরীক্ষা কেন্দ্রে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার শিকার মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে নামাজে জানাজার পর সন্ধ্যা ৬টায় সোনাগাজী আল হেলাল একাডেমির পাশে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয় নুসরাতকে। চোখের পানিতে বুক ভিজিয়ে নুসরাতকে কবরে শায়িত করেন বাবা মাওলানা মুসা মানিক ও বড় ভাই নোমানসহ আত্মীয়-স্বজনরা। এ সময় কবরস্থান এলাকায় তৈরি হয় হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি। নুসরাতের বাবা ও ভাইয়ের কান্নায় ভিজে যায় কবরের মাটি। এর আগে নামাজে জানাজা পড়ান নুসরাতের বাবা মাওলানা মুসা। জানাজা শেষে নিজ মেয়ের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। জানাজায় উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বড় ভাই নোমান।

নোমান বলেন, আমার বোন দীর্ঘ পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। বোন আমার যে কষ্ট করেছে, তা বলে বোঝানো যাবে না। আইসিইউতে আমার বোন বাবার কাছে কয়েক ফোটা পানি চেয়েছিল, বাবা দিয়েছিলেন সেই পানি। আমি আমার বোন হত?্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও ফেনী ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি আলাউদ্দিন নাসিম, জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুজ্জামান, পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, অতিরিক্ত জেলা প্রসাশক পি কে এম এনামুল করিম, সোনাগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, ইউএনও সোহেল ফারভেজ প্রমুখ। এছাড়াও জানাজায় অংশগ্রহণ করে ১৫ হাজারেরও অধিক মানুষ।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছে। সঙ্গে নুসরাতের মা-বাবা ও ভাইয়েরা ছিলেন। লাশ পৌঁছানোর পর সেখানে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শত শত মানুষ রাফির জন্য হাহাকার করতে থাকেন। কান্নার রোল পড়ে যায় চারদিকে। আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ।

সোনাগাজী পৌর এলাকার উত্তর চরচান্দিয়া এলাকার মেজো মৌলভী বাড়িতে লাশ এসে পৌঁছালে সর্বস্তরের মানুষ নুসরাতকে দেখতে আসে। এ সময় ওই বাড়িতে তৈরি হয় শোকাবহ পরিবেশ। পড়ে যায় কান্নার রোল। তৈরি হয় শোকাবহ পরিবেশ।

এর আগে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে নুসরাতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে লাশ তার পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সকালে নুসরাতের ময়নাতদন্তের জন্য তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ময়নাতদন্ত শেষে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, বড় ধরনের বার্নের কারণেই নুসরাতের মৃত্যু হয়েছে। তবে তার চিকিৎসায় সব ধরনের চেষ্টাই করা হয়। ময়নাতদন্তে হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তার (নুসরাত) ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছেন। অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনার রিপোর্ট পেলেই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশিত হবে।

গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা।

এর আগে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দেয় তারা।

আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চিকিৎসায় গঠিত হয় ৮ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড।

সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উন্নত চিকিৎসার জন্য নুসরাতকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোরও পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু সবার প্রার্থনা-চেষ্টাকে বিফল করে বুধবার রাতে চলেই গেল ‘প্রতিবাদী’ নুসরাত।

এদিকে ওই ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ, ২৭ মার্চ মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা তার কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। তারই জেরে মামলা করায় নুসরাতকে আগুনে পোড়ানো হয়। ওই মামলার পর সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

"