সিঙ্গাপুরে নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

জড়িতদের বিচার চেয়েছেন মৃত্যুপথযাত্রী নুসরাত

ফেনীতে গ্রেফতার ৭

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফেনীর সোনাগাজীতে দুর্বৃত্তদের আগুনে দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের উপদফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া ওই শিক্ষার্থীকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এ তথ্য জানান। দগ্ধ নুসরাত জাহান রাফিকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন। এ ঘটনায় সোমবার অগ্নিদগ্ধ ওই শিক্ষার্থীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এ মামলায় চারজন মহিলাসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ (মৃত্যুশয্যায় দেওয়া বক্তব্য) দিয়ে জড়িতদের বিচার চেয়েছেন।

গতকাল সোমবার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, মেয়েটির অবস্থা ভালো না। সোমবার সকালে তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ দিকে চলে যায়। বেলা সাড়ে

১১টার দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। আমরা তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।

এদিকে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ (মৃত্যুশয্যায় দেওয়া বক্তব্য) দিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরিহিত চারজন তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। ওই চারজনের একজনের নাম ছিল শম্পা। আমার যা কিছু হয় হয়ে যাক প্রিন্সিপাল সিরাজ উদ দৌলা ও তার সহযোগী যারা আমার গায়ে আগুন দিয়েছে তাদের যেন বিচার হয়।’

তার ভাই রায়হান বলেন, এ কথাগুলো বলার সময় ওর শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেনি, ওকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

ঢাকা মেডিকেল ক?লেজের বার্ন ও প্লা?স্টিক সার্জারি ইউনি?ট সূত্র ত?থ্যের সত্যতা নি?শ্চিত করে?ছে। দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ওই ছাত্রী একজন চি?কিৎস?কের কা?ছে বক্তব্য দেন। মুমূর্ষু রোগী?দের কাছ থে?কে এ ধর?নের বক্তব্য নেওয়া হ?য়ে থা?কে, যা পরবর্তী? সময়ে আদাল?তে সাক্ষ্য হি?সে?বে ব্যবহৃত হ?য়।

এ সময় সামান্ত লাল সেন বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থীকে যাতে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয় সে বিষয়ে কথা বলতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটু আগে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। তিনি তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন। প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, তাকে যদি সিঙ্গাপুরে পাঠানোর মতো হয় তাহলে যেন দ্রুত পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পর আমি সিঙ্গাপুরে তার চিকিৎসার কাগজপত্র পাঠিয়েছি। তারা রেসপন্স করলে আমরা দ্রুত পাঠিয়ে দেব।’ তিনি বলেন, ‘সাধারণত এত বেশি শতাংশ দগ্ধ রোগী সিঙ্গাপুরের কোনো হাসপাতাল নিতে চায় না। তারপরও আমরা সিঙ্গাপুরে কথা বলছি। আমরা চেষ্টা করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতে। তাই আমি এখানে তাকে দেখতে এসেছি। প্রধানমন্ত্রী তাকে সিঙ্গাপুর পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তার চিকিৎসার সব খরচ সরকার বহন করবে।’ তিনি বলেন, ‘যারা এই অপরাধ করেছে তাদের বিচার তো হবেই। আমরা এখন তার স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছি। তাকে যেকোনো মূল্যে সুস্থ করার চেষ্টা আমরা করছি।’

সোনাগাজী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, এই ঘটনায় এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোববার আটক করা হয় মাদ্রাসার ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক আবছার উদ্দিন ও দগ্ধ নুসরাতের সহপাঠী আরিফুল ইসলামকে। এরপর মাদ্রাসার দারোয়ান মো. মোস্তফা, অফিস সহায়ক নূরুল আমিন, সাইফুল ইসলাম, আলা উদ্দিন ও জসিম উদ্দিনকেও আটক করা হয়।

এর আগে ওই ছ?াত্রী জানান, ক?য়েক বছর ধ?রে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নারী শিক্ষার্থী?দের হয়রা?নি ক?রে আস?ছেন। তি?নি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র দি?য়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন। তার কথায় রা?জি না হ?লে তি?নি হেনস্তা ক?রতেন। আগে এ বিষ?য়ে প?রিবার?কে না জানা?লেও গত ২৭ মার্চ তার স?ঙ্গে অধ্যক্ষ অশোভন আচরণ ক?রেন। বিষয়টি ওই শিক্ষার্থী প?রিবার?কে জানান, মাদ্রাসার অন্য শিক্ষার্থী?দেরও জানান। অধ্যক্ষের বিরু?দ্ধে মামলা হওয়ার পর থে?কে তি?নি ভাই?য়ের স?ঙ্গে মাদ্রাসায় যা?চ্ছি?লেন। ঘটনার দিন তার ভাইকে ভেত?রে ঢুক?তে দেওয়া হয়?নি।

গত শনিবার সকাল ৯টার দিকে আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যায় ওই ছাত্রী। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বোরকা পরিহিত ৪/৫ ব্যক্তি ওই ছাত্রীর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখান প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

ঢামেকের বার্ন ইউনিটে লাইফ সাপোর্টে থাকা ওই ছাত্রীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, শনিবার সকালে তার বোনের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা ছিল। তাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যান তিনি। তবে কেন্দ্রের প্রধান ফটকে নোমানকে আটকে দেন নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা। এরপর তার বোন একাই হেঁটে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এ সময় নোমান কেন্দ্রে থেকে একটু দূরে চলে আসেন। এর ১৫-২০ মিনিট পরই মোবাইলে তিনি তার বোনের অগ্নি দগ্ধের খবর পান। ফের কেন্দ্রে ছুটে গিয়ে বোনকে দগ্ধ অবস্থায় দেখতে পান তিনি।

ভুক্তভোগী মাদ্রাসাছাত্রী সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরছান্দিয়া গ্রামের মাওলানা এ কে এম মানিকের মেয়ে। অভিযোগ আছে, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা এর আগে ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করে। এ কারণে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা বর্তমানে ফেনী কারাগারে আছেন।

"