সেন্টমার্টিনে বিজিবি

* ২২ বছর পর ফোর্স মোতায়েন * দ্বীপটিকে মিয়ানমার নিজেদের দাবি করায়, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ * প্রতিবাদের মুখে তুমব্রু সীমান্তে লোহার নেট বসানো বন্ধ

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা সেন্টমার্টিনে আবার টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। দ্বীপটিতে ভারী অস্ত্রসহ নতুন চৌকি স্থাপন করেছে বাংলাদেশের এই সীমান্তরক্ষী বাহিনী। গতকাল রোববার সকাল থেকে বিজিবির টহল শুরু হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দ্বীপে বিজিবির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এরপর থেকে দ্বীপে কোস্টগার্ড কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সেন্টমার্টিন থেকে বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গা আটক করেছে কোস্টগার্ড, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি। বিভিন্ন সময় ওই এলাকায় দস্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এসব নিয়ন্ত্রণে টেকনাফ থানার একটি পুলিশ ফাঁড়িও রয়েছে সেন্টমার্টিনে। তবে বর্তমান সরকার মনে করছে, সেন্টমার্টিনের নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন দরকার। তাই নতুন করে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রায় চার দশকের সমুদ্রসীমা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। এরপর দেশটির রাখাইন প্রদেশে সেনা নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দুই দফায় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। সেই রোহিঙ্গাদের এখন ভরণ-পোষণ করছে বাংলাদেশ। এরপর ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করেছিল মিয়ানমার। তখন দেশটির জনসংখ্যাবিষয়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে যে মানচিত্র প্রকাশ করা হয়, তাতে সেন্টমার্টিনকে তাদের ভূখ-ের অংশ বলে দেখানো হয়। গত ৬ অক্টোবর মিয়ানমারের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত উ লুইন ওকে তলব করে এর প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর মিয়ানমারের মানচিত্র থেকে সেটি পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার বান্দরবান-মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু শূন্যরেখার খালের ওপর নির্মিত সেতুর নিচে লোহার নেট বসানোর চেষ্টা করে মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশ (বিজিপি)। পরে বিজিবির কড়া প্রতিবাদের মুখে নেট বসানো বন্ধ করে দেয় বিজিপি। এ রকম নানা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ছে।

সেন্টমার্টিনে দীর্ঘ ২২ বছর পর বিজিবি মোতায়েনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, সেন্টমার্টিন আমাদের শেষ সীমানা। সেখানে আগেও বিজিবি মোতায়েন ছিল। সেন্টমার্টিনের নিরাপত্তার জন্যই সেখানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তবে মিয়ানমার দুবার সেন্টমার্টিনকে তাদের ভূখ- হিসেবে যে দাবি করেছিল, সে বিষয়টিও সরকারের মাথায় আছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা মোতায়েন থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

সেন্টমার্টিনে বিজিবির চৌকি স্থাপন, টহল জোরদার

গতকাল সকালে টেকনাফের দমদমিয়া পর্যটক জাহাজ ঘাট থেকে কেয়ারি ডাইন ক্রস করে বিজিবির সদস্যরা সেন্টমার্টিনে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে অস্থায়ী কার্যালয়ে মালামাল ও সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়। মূলত সীমান্ত সুরক্ষায় ও চোরাচালান রোধে নতুন করে বিজিবি মোতায়েন হয়েছে বলে জানান টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়ন বিজিবির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক লে. কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান।

সেন্টমার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান নূর আহাম্মদ জানান, গতকাল রোববার একটি পর্যটকবাহী জাহাজে করে শতাধিক বিজিবি সদস্য টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে আসেন। বিজিবির একটি চৌকি স্থাপন হচ্ছে দ্বীপে। তবে আপাতত তারা দ্বীপের আবহাওয়া অফিস কার্যালয়ে উঠেছেন। এর ফলে দ্বীপের পর্যটকের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা আরো জোরদার হবে।

কক্সবাজার-সংলগ্ন প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন সৃষ্টি থেকে বাংলাদেশের ভূখ-ের অন্তর্গত। ব্রিটিশ শাসনাধীন ১৯৩৭ সালে যখন বার্মা ও ভারত ভাগ হয় তখন সেন্টমার্টিন ভারতে পড়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সেন্টমার্টিন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এটি বাংলাদেশের অন্তর্গত। ১৯৭৪ সালে সেন্টমার্টিনকে বাংলাদেশের ধরে নিয়েই মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা চুক্তি হয়।

প্রতিবাদের মুখে তুমব্রু সীমান্তে লোহার নেট বসানো বন্ধ

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু শূন্যরেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সরাতে নতুন পাঁয়তারা শুরু করেছে মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশ (বিজিপি)। সীমান্তে দেশটির অভ্যন্তরে ঘন ঘন গুলিবর্ষণ, রাতে কাঁটাতারঘেঁষে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ নানা আতঙ্ক ছড়িয়ে আসছিল তারা। সম্প্রতি তুমব্রু খালের ব্রিজের নিচে লোহার রড দিয়ে নেট তৈরি করার চেষ্টা করছে তারা। এতে বর্ষা মৌসুমে শূন্যরেখা ক্যাম্প ও স্থানীয় বসতভিটা কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাবে বলে দাবি রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের। তবে গতকাল কক্সবাজার-৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আলী হায়দার আহমদ মিয়ানমার বিজিপিকে শূন্যরেখার ব্রিজের নিচে লোহার নেট তৈরির কাজ বন্ধ করতে কড়া প্রতিবাদ জানালে সরে যায় তারা।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে এসে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে চার হাজার রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গাকে মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে রেডক্রস। শূন্যরেখার রোহিঙ্গাদের সরাতে বারবার নানা অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিজিপি।

"