দাবি এবার পাক সেনাদের বিচার

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

আইনি বাধা না থাকলেও এগোচ্ছে না একাত্তরে গণহত্যার দায়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের উদ্যোগ। কিন্তু সেই উদ্যোগটি সরকারকে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা বলছে, সরকারের নির্দেশনা পেলেই শুরু হবে তদন্ত। কারণ এ বিচার ছাড়া ইতিহাসের দায় পুরোপুরি মোচন হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশীয় পাকিস্তানের দোসরদের মাধ্যমে সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদন্ড পাওয়া বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদন্ড এরই মধ্যে কার্যকর করা হয়েছে।

এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী। এটিকে সরকারের সাফল্য বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থা প্রধান সমন্বয়কারী এম এ হান্নান খান সাংবাদিকদের বলেন, এ বিচার যদি হয় তাহলে ইতিহাসে খাতায় আমরা লিখতে পারব যে, আমরা ওই অপরাধীদের শাস্তি দিয়েছিলাম। তবে সেই উদ্যোগটি সরকারকে নিতে হবে। একইসঙ্গে গণহত্যার দায়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিচার করা সম্ভব বলেও মনে করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়কারী।

বাঙালিকে দমন করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে সুপরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। ওই সেনা অভিযানের কোড নেম বা সাংকেতিক নাম ছিল অপারেশন সার্চলাইট। যুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেক চেষ্টা করেও গণহত্যার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দিতে পারেনি। গণহত্যার অন্যতম ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী নিজের গা বাঁচানোর জন্য তদন্ত কমিটির কাছে বলেছেন, লে. কর্নেল ইয়াকুব মালিকের নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২৭ ও ২৮ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসে বাঙালি অফিসারসহ ১৯৫ জন নিরীহ মানুষকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। সালদা নদীর এলাকায় ৫০০ জনকে হত্যা করা হয় এবং গ্রামাঞ্চলে ও ছোট শহরগুলো শত্রুমুক্ত করার নামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্দয়ভাবে ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ চালায়।

একজন ব্রিগেড কমান্ডার, ব্রিগেডিয়ার ইকবালুর রহমান তার জবানবন্দিতে বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসান পূর্ব পাকিস্তানের সেনা ইউনিট পরিদর্শনের সময় সৈনিকদের জিজ্ঞাসা করতেন, তুমি কয়জন বাঙালিকে মেরেছ? আরেকজন অফিসার লে. কর্নেল আজিজ আহমদ খান সাক্ষ্যে বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে তার ইউনিটে গিয়ে জেনারেল নিয়াজি জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কত হিন্দু মেরেছ? জেনারেল নিয়াজি তার নিজের লেখা ‘The betrayal of East Pakistan’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন জেনারেল টিক্কা খান তাকে বলেছিলেন, আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।’ নিয়াজি তার বইয়ে লিখেছেন টিক্কা খান পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করেন এবং সে অনুসারে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জানজেব আরবাব হুকুম পালন করেন। জেনারেল ফরমান আলী তার টেবিল ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূমি বাঙালির রক্তে লাল করা হবে।’ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একাত্তরে বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। মাত্র আট মাস ২২ দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৩০ লাখ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে। এত অল্প সময়ে এত বড় ভয়ংকর গণহত্যা বিশ্বে আর কোথাও হয়নি। বাংলাদেশের এ গণহত্যা পাকিস্তান সেনাবাহিনী চালায় আনুষ্ঠানিক লিখিত মিলিটারি অপারেশন আদেশ জারির মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাংলাদেশজুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ চালায় পাকিস্তানি সেনারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার গবেষণায়, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের নীল-নকশা তৈরি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জড়িত জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল হামিদ, জেনারেল টিক্কা খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি, মেজর জেনারেল রাও ফরমানসহ অন্তত ১৯৫ জন জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মতে, গণহত্যার মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী পাকিস্তানি সেনাদের বিচার ছাড়া ইতিহাসের দায় পুরোপুরি মোচন হবে না। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সভাপতি শাহরিয়ার কবির মনে করেন, এ বিচার যদি না করা হয়, তাহলে গোটা চলমান বিচার প্রক্রিয়াটাই একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। তাছাড়া যারা পরিণতির শিকার তাদের আমরা কী জবাব দিব। এরা দীর্ঘ সময় ধরে এই বিচারের অপেক্ষা করছে। সুতরাং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গেলে, হত্যাকারীদের শাস্তি দিতে গেলে, এই বিচারের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা বলছে, সরকারের নির্দেশ দিলেই ১৯৫ পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তখনকার হাইকমান্ড ও যুদ্ধাপরাধে জড়িত সেনাদের বিচারে আইনগত কোনো বাধা। জানা যায়, পাকিস্তানি সেনাদের বিচার শুরুর আগে একাত্তরে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে চাইছে সরকার। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজুলেশন ২৬০ (৩)-এর অধীনে গণহত্যার সংজ্ঞায় গণহত্যা বলতে এমন কর্মকান্ডকে বোঝানো হয়েছে যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। এই সংজ্ঞা অনুসারে গণহত্যা কেবল হত্যাকান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপরোক্ত উদ্দেশ্যে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিসাধন, জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার মতো জীবননাশী অবস্থার সৃষ্টি করা, জন্ম ও জীবনধারণ প্রতিরোধ করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া, একটি জাতি বা গোষ্ঠীর শিশু সদস্যদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্ম পরিচয় ও জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলাকেও গণহত্যার সংজ্ঞার আওতাভুক্ত। এই রেজুলেশন অনুযায়ী গণহত্যা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শুধু তাই নয়, গণহত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, এমনকি যারা এ কাজে উদ্বুদ্ধ করবেন তারাও এই অপরাধের কারণে বিচারাধীন হবেন। এ উদ্বুদ্ধকরণের বিষয়টি সরাসরি হোক, নিভৃতে হোক কিংবা জনসমক্ষে উত্তেজক বক্তব্যের মাধ্যমেই হোক তা সমানভাবে গুরুতর অপরাধ। গণহত্যার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও বিচারযোগ্য অপরাধে অপরাধী হিসেবে পরিগণিত হবেন। গণহত্যা সব সময়ই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফসল, যা প্রতিরোধে বিশ্বের সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।

এদিকে ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সংক্রান্ত এক ঘোষণাপত্রে বলা হয় ‘মানব ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে তার মধ্যে স্বল্পতম সময়ে সংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ গণহত্যা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ১২ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।’ এই ঘোষণাপত্রটি বের হয় ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর।

 

"