বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ছিল নিরস্ত্র বাঙালির অস্ত্র

‘আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র’

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

‘সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়েছে। আমি ঘোষণা করছি, আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সর্বস্তরের নাগরিকদের আমি আহ্বান জানাচ্ছি, সম্মিলিতভাবে শত্রুর মোকাবিলা করুন। আপনারা যে যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন, যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।’Ñ এই ঘোষণা ছিল বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু এভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মূলত একাত্তরে নিরস্ত্র বাঙালির অস্ত্র ছিল বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতা ঘোষণা। তিনি তার জন্ম মাসেই হাজার বছর ধরে পরাধীন বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই ঘোষণা ছড়িয়ে যায় মানুষের মুখে মুখে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ সশস্ত্র হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধুর অমোঘ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে শুধু অদম্য মনোবলকে সম্বল করে নিরস্ত্র বাঙালি মুখোমুখি হয় পাকিস্তানের আধুনিক সমরসজ্জিত, প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। ছিনিয়ে আনে মহামূল্যবান স্বাধীনতা। তাই আজও যখন লাউন্ড স্পিকারে বেজে উঠে ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই, যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই, মুক্তি চাই’ তখন চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার লিখিত বাণী ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে মেসেজ আকারে পাঠানো হয়। ওই বার্তা চট্টগ্রাম ইপিআর সদর দফতরে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম উপকূলে নোঙর করা একটি বিদেশি জাহাজও মেসেজ গ্রহণ করে। চট্টগ্রামে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী সাইক্লোস্টাইল করে রাতেই শহরবাসীর মধ্যে বিলির ব্যবস্থা করেন। পরে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান দুপুর ২টা ১০ মিনিটে এবং ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঘোষণাপত্রটি ব্যাপক প্রচারের সিদ্ধান্ত নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। তারই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর নগরীর জুপিটার হাউসের বাড়িতে সাইক্লোস্টাইল যন্ত্রটি নিয়ে সারা রাত ধরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অসংখ্য কপি করা হয়। তা চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। পরে সেটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে জুপিটর হাউসে। দেশ স্বাধীনের পর সেটি আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বাড়ি থেকে কলেজের জন্য চেয়ে নেন তৎকালীন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান। সেটি দিয়ে বিভিন্ন সময় কলেজের প্রশ্নপত্র ছাপানোসহ নানা কাজে ব্যবহার হয়েছে। পরে তা কলেজ কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে রাখে।

২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নৌশিক্ষা কেন্দ্র বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ৫৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে এটি প্রদর্শন করা হয়।

এ ঘোষণা শুনেই হত্যাযজ্ঞের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়ে, শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তবে এরও আগে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শোষিত-নির্যাতিত বাঙালি জাতিকে মুক্তির জন্য অস্থির-পাগল করে তুলেছিলেন। সেদিন তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বাঙালির অবিসংবাদিত এ নেতা বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

কার্যত সেটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, যার পথ ধরে কালোরাতের পর শুরু হয় বাঙালির প্রতিরোধ পর্ব। ৯ মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার চূড়ান্ত আহ্বানটি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাও দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষার উন্মাতাল সেই আহ্বান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শ্যামল বাংলার আনাচে কানাচে। মূলত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই ছিল ৯ মাসব্যাপী বাংলার মুক্তি সংগ্রামের মূলভিত্তি। আর ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা চূড়ান্ত প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। শেষে আসে কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা; জন্ম হয় বাংলাদেশ নামে নতুন একটি রাষ্ট্র।

যদিও আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক উন্মেষ ঘটেছিল ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে। বাঙালিত্বের চেতনা মূর্ত হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে ও রচনায়। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি;’ আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’; ‘স্বার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’- প্রভৃতি গানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা উদ্ভাসিত হয়েছে। নাৎসি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ সব সময় বিদ্বেষ নয় সম্প্রীতির কথা বলেছে। ৭০০ বছর আগে বাংলার কবি চন্ডিদাস লিখেছিলেন- ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ ১৫০ বছর আগে বাংলার আরেক মরমি কবি লালন শাহ লিখেছেন- ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ আর খৃস্টান/ জাতিগোত্র নাহি রবে।’ প্রায় ১০০ বছর আগে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন- ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম জিজ্ঞাসে কোনজন/ কান্ডারী বলে ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।’ বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল এই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদ।

পরে ৫২ সালের একুশের চেতনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। একুশের চেতনায় ৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ৫৮-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন এবং ৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যায় চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে। আর সেই চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ বাতলে দেন বাঙালির হাজার বছরের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। তাই খুব সংগতভাবেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক তিনি।

ইতিহাস আমাদের সাক্ষ্য দেয়, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনকে বেগবান করে। পরবর্তী সময়ে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি এবং ৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয় এ দেশের গণমানুষের জন্য এক আশীর্বাদ। বাঙালির এসব বিজয়ের নেপথ্যে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। দেশ স্বাধীনের পর ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশকে পুনর্গঠনে কাজে হাত দেন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে অসাধারণ সংবিধান প্রণয়ন করেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিসহ পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনাসহ নানা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুর এসব পরিকল্পনাকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি। তারা চেয়েছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা যেন পিছিয়ে থাকে।

তাই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ অপশক্তি শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই বসে থাকেনি, তারা জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় চার জাতীয় নেতাকেও নির্মমভাবে হত্যা করে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় তৈরি করে। তারপর বাংলাদেশের বুকে নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ভুলুণ্ঠিত হতে থাকে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে। কেটে যায় অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। সেই থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হয় বাঙালির দ্বিতীয় অগ্রযাত্রা। পিতার যোগ্য কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা ইতিহাসের দায়মুক্তির পথে চলতে শুরু করেন। দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা, গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের জায়গায় সবাইকে নিয়ে শুরু করেন এক নতুন অভিযাত্রা। পিতার মতো বাংলাদেশকে উন্নয়নে, গণতন্ত্রে, মানবিকতায়, নেতৃত্বে পৃথিবীর বুকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে কাজ করছেন নিরলস।

 

"