বাঙালির অহংকারের দিন

অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় বিস্ময়কর উন্নতি

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

শাহজাহান সাজু

১৯৭১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে যে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার তার ৪৮ বছর পূর্তি উদ্যাপন করা হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আর্থসামাজিক প্যারামিটারে বাংলাদেশের উন্নয়ন বিস্ময় হিসেবে বিশ্ব দরবারে আত্মপ্রকাশ করেছে। এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতা অর্জন করেছে দেশটি। বিশ্বে বিস্ময়মানা বাংলাদেশের এ সাফল্য একদিনে আসেনি। রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে নানা চড়াই-উতরাইকে যেমন এ দেশের মানুষ উতরেছে, ঠিক তেমনি একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশে ছিল পরাজিত দেশি-বিদেশি শক্তিগুলোর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র।

বাঙালি জাতিকে দমন করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সেই অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরে ঢাকায় চালানো হয় গণহত্যা। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইপিআরের বেতারে তার এই ঘোষণা প্রচারিত হয়। অবশ্য তার আগেই ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভায় বাঙালির অবিসংবাদিত এই নেতা বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি বাঙালি জাতিকে শত্রুর মোকাবিলা করার আহ্বান জানান। কার্যত সেটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। যার পথ ধরে কালরাতের পর শুরু হয় বাঙালির প্রতিরোধ পর্ব।

যুদ্ধ, ধ্বংস আর স্বজন হারানোর দুঃসহ বেদনার মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে ৪৮ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার নবীনতম এই দেশটির যখন জন্ম হয় তখন বিশ্বে একে ডাকা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিদের প্রায় ৩০০ বছরের শাসন-শোষণে প্রায় নিঃশেষিত এই ভূখন্ড একদিন বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে উপস্থাপিত হবে তা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। কিন্তু সেই দুঃসাধ্যকে বাস্তবে পরিণত করেছে বাংলাদেশ।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন বিশ্বে উদাহরণ। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আর্থসামাজিক প্যারামিটারে বাংলাদেশ উন্নয়ন বিস্ময় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর্থসামাজিক বেশিরভাগ সূচকে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়াকে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা তিন সূচকে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করায় জাতিসংঘ মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশকে।

স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘাতকরা নির্মমভাবে হত্যা করে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে রেহাই পায়নি ছোট্ট শিশু রাসেলও। এরপর একের পর রাজনৈতিক হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্জনকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। দীর্ঘ সামরিক শাসনের কালো ছায়াও গ্রাস করেছে জাতীয় জীবনে। তবু মানুষ লড়াই করেছে। বারবার রক্ত দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে গণতন্ত্র। কাঁধে কাঁধ মিশিয়ে দেশে ও প্রবাসে নিরলস কাজ করে এগিয়ে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ নানা বিশ্ব সংস্থা বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রশংসা করছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে আইএমএফের মূল্যায়ন, যেভাবে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য দূর এবং বৈষম্য কমানোকে সংযুক্ত করেছে তা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন উদাহরণ দেওয়ার মতো একটি দেশ। ২০১৪ সালেই বিশ্বব্যাংক একটি টেবিল উপস্থাপন করে দেখিয়ে ছিল প্রধান ১২টি সূচকের মধ্যে ১০টিতেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৯০ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৭ শতাংশ, সেটা এখন কমে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। জনসংখ্যা, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশকে পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নিম্নআয়ের দেশগুলোতে গড় মাথাপিছু আয় ছিল ৫২৮ ডলার। আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয় ১ হাজার ১৭৬ ডলার। সে সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ২৪ ডলার। আর এখন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ ডলার। স্বাধীনতার ঠিক পরই দেশের মানুষ গড়ে বেঁচে থাকত ৪৬ বছর, এখন সেই গড় ৭১ বছর। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার গড় হচ্ছে ৬৫ বছর। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি স্কুলে যায় বাংলাদেশেই।

বিবিএসের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্যের হার কমতে কমতে ২৪ দশমিক তিন শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রায় অর্ধেক বাড়িঘর টিন ও কাঠের তৈরি। প্রায় ৩০ শতাংশ রয়েছে পাকাবাড়ি। প্রায় ৯৫ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানি পান করছে। বেড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হারও।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় এখন (২০১৮-১৯ অর্থবছর) ১ হাজার ৯০৯ ডলার। গত বছরে এই অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৭৫১ ডলার। আর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত বছর প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

এদিকে, দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান সমান সমান হলেও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। গত কয়েক বছরে যোগাযোগ ও প্রযুক্তিগত সেবার উন্নয়নে বিস্ময়কর সফলতা এসেছে, সফলতা এসেছে কৃষিতেও। গত কয়েক বছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। শাকসবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) তথ্য অনুসারে, আম উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অবস্থান অষ্টম। আর মোট ফল উৎপাদনে বিশ্বে ২৮তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

নারীর অগ্রগতির নানা সূচকে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এই খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। ১৪৪টি দেশের নারী-পুরুষ সমতায় বিভিন্ন অবস্থান নিয়ে প্রতি বছর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এই তালিকায় বাংলাদেশ ৪৭, মালদ্বীপ ১০৬, ভারত ১০৮, শ্রীলঙ্কা ১০৯, নেপাল ১১১, ভুটান ১২৪ ও পাকিস্তান রয়েছে ১৪৩তম অবস্থানে। শিক্ষাক্ষেত্রেও নারীর অগ্রগতি ঈর্ষণীয়।

গত কয়েক বছরে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ ও বন্দরের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পদ্মা সেতু এখন স্বপ্ন নয় বাস্তব। ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। পায়রা ও কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে আরো দুটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। সারা দেশে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা নির্মাণ করা হচ্ছে।

 

"