‘যন্ত্রদানবের হিংস্রতা’ আর কত!

* শৃঙ্খলা ফেরাতে ফের ডিএমপির অভিযান * বেপরোয়া চালক-পথচারী * বাস্তবায়ন হয়নি দেড় শ সুপারিশের অধিকাংশ

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

পরিবহন নৈরাজ্যে সড়কে বারবার ঝরছে রক্ত, প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার মতো দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিনই ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। প্রাণ যাচ্ছে যাত্রী কিংবা পথচারীর। এ যেন কোনোভাবেই থামার নয়। বেপরোয়া চালকের হাতে জীবন সঁপে দিয়ে চলাচল করছেন যাত্রী-পথচারীরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের পরও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি। তড়িঘড়ি করে নানা উদ্যোগ নিয়ে সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা আনা গেলেও তা টেকসই হয়নি। ফলে দুর্ঘটনাও কমেনি, ঝুঁকি রয়ে গেছে পদে পদে। তাই আবার নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে সড়ক শৃঙ্খলায় কঠোর অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও।

প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে। থামছে না মৃত্যুর মিছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আইনকানুন মানছে না বলেই সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্য চলছে। অদক্ষ চালকের অবহেলা, অত্যধিক যাত্রী বহনের মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রবণতা, সর্বোপরি বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, সড়কের সক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত গাড়ি, বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংয়ের কারণেই সড়কে মৃত্যুর ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। আর বেপরোয়া গতিই কেড়ে নিচ্ছে অজস্র তাজা প্রাণ।

এদিকে ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে ডিএমপির পঞ্চম দফার ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ। ট্রাফিক সচেনতার মধ্যে গত ১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণির বসুন্ধরা গেটের সামনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর প্রাণ কেড়ে নিল সুপ্রভাত পরিবহন নামে এক ‘যন্ত্রদানব! এ ঘটনার পর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে আবরারের সহপাঠীরা। পরদিন সে আন্দোলন রাজধানী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। টানা তিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের আশ্বাসে সড়ক অবরোধ তুলে নেন তারা। তবে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন সাময়িক স্থগিত হলেও ‘যন্ত্রদানবের হিংস্রতা’ যেন থামেনি সামান্যটুকুও।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গাবতলীতে বালুর ট্রাকচালকের বর্বরতায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এক মাদরাসাশিক্ষকের শরীর। এ দিন সারা দেশে আরো চার শিক্ষার্থীর রক্তে ভিজেছে সড়ক। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে কলেজছাত্র, নরসিংদীতে স্কুলছাত্র এবং খুলনা ও টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে দুই শিশু শিক্ষার্থী সড়কে প্রাণ দিয়েছে। এ ছাড়া হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল এবং ভোলার চরফ্যাশনে আলাদা সড়ক দুর্ঘটনায় আরো তিনজনসহ প্রাণ গেছে অন্তত ১৭ জনের। আর গতকাল শুক্রবার বরিশালে তিন নারীসহ ছয়জন এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় আরো চারজনসহ ১০ জন নিহত হয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনায় ঘাতক সেই ‘যন্ত্রদানব’রূপী বাস!

সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাসের অনৈতিক প্রতিযোগিতায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

প্রতিনিয়ত মূল্যবান জীবন নষ্ট হচ্ছে। সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ আতঙ্কিত। ট্রাফিক সপ্তাহের মেয়াদ বাড়ানোসহ সংশ্লিষ্টদের শত চেষ্টাতেও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। বাসসহ সব ধরনের যানবাহন চলছে আগের মতোই। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘বাস দাঁড়ানো নিষেধ, দাঁড়ালেই দ-’ লেখা এমন শত শত সাইনবোর্ড রাস্তার পাশে, মোড়ে বসানো হলেও তাতে প্রতিকার মিলছে না। বরং ওইসব সাইনবোর্ড ঘেঁষেই বাসগুলো দাঁড়াচ্ছে। জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ তেমনটা ব্যবহার করেন না পথচারীরা। চালকরাও তোয়াক্কা করছে না জেব্রা ক্রসিংয়ের। রাজধানীর ২০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বিশেষ কয়েক স্পট পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, চালকরা আগের মতোই বেপরোয়া। নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতায় মত্ত তারা।

বাস্তবায়ন হয়নি দেড় শ সুপারিশ : সড়কে কোনো দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হলেই কেবল তৎপরতা বাড়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের। ‘নিরাপদ সড়ক’ নিশ্চিতে ঢাকঢোল পিটিয়ে গঠন করা হয় বিভিন্ন কমিটি ও উপকমিটি। এভাবেই কয়েক মাস চলে বৈঠকের পর বৈঠক। নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ। দেওয়া হয় সুপারিশমালা। কিন্তু সেসব সুপারিশ নানা অজুহাতে ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। আগের অবস্থানেই ফিরে যায় সব। আবার সড়কে ঘটে প্রাণহানি। বাড়তে থাকে মৃত্যুর মিছিল। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বাসচাপায় বিইউপির শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর আগের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। ঘটনার দিন ঘোষিত দুর্ঘটনাস্থলটিতে নিহতের নামে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তুরও স্থাপন করেন ঢাকা উত্তরের মেয়র। এ নিয়ে চলছে তাদের কর্মব্যস্ততা। দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে, নিজেদের ব্যর্থতার কথা সরাসরি প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, এর আগে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে ১২৯ দফা সুপারিশ করেছে সরকারের বিভিন্ন কমিটি ও সংস্থা। দুদকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় আরো ২১টি সুপারিশ। কিন্তু বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনাও উপেক্ষিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সময়ে দেওয়া আদালতের নির্দেশনাও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা তাদের স্বার্থের বাইরের কোনো সুপারিশ মানতে নারাজ বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

গত বছর ২৯ জুলাই রাজধানীতে দুই বাসের চাপায় পড়ে দুই কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের উত্তাপে কিছু কিছু নির্দেশনা অনসুরণ করা হলেও পরে বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৫ সালে সিটিং সার্ভিস বন্ধের নামে যাত্রী জিম্মি করে পুরো ঢাকায় পরিবহন নৈরাজ্য তৈরি করেছিল পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। ওই ঘটনায় গঠিত কমিটি ২৬ দফা সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেসব সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। সড়ক নিরাপত্তায় বিআরটিএ গঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক উপকমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ৮৬টি সুপারিশ করেছিল; যার সিংহভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। একইভাবে ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা, ২০১৭-২০২০’ বাস্তবায়নে চিঠি চালাচালি ছাড়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

এদিকে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমানের দাবি, বেশির ভাগ সুপারিশই বাস্তবায়ন হয়েছে। সড়ক নিরাপদ করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যেসব সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে। তবে ভিন্ন কথা বলেছেন সড়ক বিশেষজ্ঞ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হচ্ছে না। আবার এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হলেই দুর্ঘটনা কমবে তাও নয়। তবে মালিক ও চালকরা একটু সচেতন হলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব মত দেন তিনি।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, বাসচালকরা কোনো কিছু মানছে না। এক প্রকার ফ্রি স্টাইলে তারা গাড়ি চালাচ্ছে। সবার আগে দরকার জনসচেতনতা, আইন মানা। আন্দোলন দরকার আছে, কিন্তু সেটা হলেও কি সমাধান হচ্ছে। মৃত্যুর ঘটনায় আন্দোলন কিংবা সংশ্লিষ্টরা সোচ্চার হলেও মৃত্যুর মিছিল থামছে না। এ জন্য দরকার পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, যতক্ষণ না পরিবহন সেক্টরে কর্মরতদের যথাযথ নিয়মকানুন মানা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দায়িত্বশীলতা না শেখানো যাবে, তত দিন সড়কে মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে না। পরিবহন খাতে দুর্নীতি-অনিয়ম কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। সেনানিবাস এলাকায় আইন মেনে যান চলতে পারলে বাইরে কেন পারবে না।

 

"