ভাষাহীন সান্ত্বনা রিনা আক্তারকে

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলায় হতাহতের ঘটনার পর বাংলাদেশেও স্বজনদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। ঘটনার সঙ্গে প্রতিক্ষণ যোগাযোগ রাখছেন, কেউ সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ

বিয়ের ১৭ দিন সংসার করে স্বামীকে হারালেন রিনা আক্তার :পলাশ (নরসিংদী) : ২০১৬ সালে আগস্ট মাসে বিয়ে হয় রিনা আক্তারের (২০)। বিয়ের ১৭ দিনের মাথায় বিদেশের মাটিতে পাড়ি দেন তার স্বামী জাকারিয়া ভূঁইয়া। প্রায় আড়াই বছর পর এবার রমজান ঈদে বাড়ি আসার কথা ছিল জাকারিয়ার। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর স্বামীকে কাছে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন নববধূ রিনা আক্তার। কিন্তু তার স্বপ্ন নিমিষেই মিলিয়ে যায় ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে হামলার ঘটনায়। হামলায় জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন জাকারিয়া ভূঁইয়া। রিনা আক্তার এখন শোকে স্তব্দ। তাকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে সবাই। রিনা আক্তার নরসিংদীর পলাশ উপজেলার গাজারীয়া ইউনিয়নের সরকারচর গ্রামের আবদুল আলীর মেয়ে।

সরেজমিন জাকারিয়ার গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর ছবিটি বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠছেন রিনা আখতার। মেয়েকে সান্ত¡Íনা দিতে ছুটে এসেছেন তার বাবা আবদুল আলী ও মা মজিদা বেগম। বাবা আবদুল আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সংসার জীবনের শুরুতেই মেয়ের জীবনে এতো বড় ক্ষতি হয়ে যাবে তা কখনো ভাবিনি।

অপরদিকে জাকারিয়া ভূঁইয়া পলাশ উপজেলার গজারীয়া ইউনিয়নের জয়পুরা গ্রামের আবদুল বাতেন ভূঁইয়ার ছেলে। জানা যায়, নিহত জাকারিয়া প্রায় আড়াই বছর আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে পাড়ি দেন। এর আগে তিনি দীর্ঘ আট বছর সিঙ্গাপুরে কর্মরত ছিলেন। শোকাহত জাকারিয়ার বাবা আবদুল বাতেন ভূঁইয়া জানান, ছেলেকে এভাবে হারাব তা কখনো কল্পনা করিনি। এখন আমরা তার লাশের অপেক্ষায় রয়েছি।

সে আমার খুব আদরের বোন

গোলাপগঞ্জ (সিলেট) : নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হোসনে আরা পারভীনের বড় ভাই নাজিম উদ্দিন আহাজারি করে বলছেন, সে আমার খুব আদরের বোন ছিল। তার সঙ্গে আর দেখা হবে না, কথা হবে না। আর আমায় ভাই বলে ডাকবে না। প্রতিদিন আর কেউ ফোন করে খবর নেবে না। গতকাল সরেজমিন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালহাটা গ্রামের নিহত হোসনে আরা পারভীনের পিত্রালয়ে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনরা আর্তনাদে মূর্ছা যাচ্ছেন। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিরা মৃত্যুর খবর শুনে গ্রামের বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন। হোসনে আরা ওই উপজেলার জাঙ্গালহাটা গ্রামের মরহুম নুর উদ্দিনের মেয়ে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হোসনে আরা পারভীনের লাশ নিউজিল্যান্ডের একটি হাসপাতালে রাখা রয়েছে। তার লাশ দেশে না আসবে কিনা তা জানতে পারছেন না স্বজনেরা। ১৯৯২ সালে বিশ্বনাথ উপজেলার ১নং মিরেরচর গ্রামের মৃত মকররম আলীর ছেলে ফরিদ আহমদের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তিনি ১৯৯৪ সালে স্বামীর সঙ্গে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমান।

যেভাবে বেঁচে গেলেন কটিয়াদীর ওমর জাহিদ

কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) : ক্রাইস্টচার্চ আল নুর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ওমর জাহিদ মাসুম এবং আফসানা আক্তার রিতু। মাসুম কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমানের কনিষ্ঠ ছেলে। উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের ধনকীপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। ২০১৫ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় নিউজিল্যান্ড যান। তার দুই বছর পর তার স্ত্রীকে নিয়ে যান। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার জুমার নামাজের একটু আগেভাগেই মসজিদে যান মাসুম। তিনি প্রথম কাতারের ইমাম সাহেবের পেছনে মিম্বরের কাছে ছিলেন। পেছন থেকে গুলির শব্দে মুসল্লিরা যখন ছোটাছুটি করছিলেন মাসুম তখন শুয়ে পড়েন। লোকজন ছোটাছুটি করে মিম্বরের দিকে এসে একের পর এক তার উপর পড়েন। পুলিশ লাশ সরাতে গিয়ে ওমর জাহিদকে জীবিত পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। সংবাদ পেয়ে তার স্ত্রী হাসপাতালে ছুটে যান। গুলিটি তার পিঠের উপরের সামান্য অংশ ভেদ করে বেড়িয়ে যাওয়ায় তিনি আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান।

অপরদিকে হামলার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন কিশোরগঞ্জের নারী আফসানা আক্তার রিতু। গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আফসানা আক্তার রিতু বলেন, মসজিদের ভেতরে হঠাৎ একটা শব্দ পাই। আমরা শব্দ শুনে দৌড়াদৌড়ি করে বাইরে আসি। ঘাতক প্রথম মেয়েদের রুমে আসেনি, গিয়েছিল পুরুষদের রুমে। আমরা তিন বাংলাদেশি নারী একসঙ্গে দৌড় দেই।

আফসানা আরো বলেন, ‘আমাদের বাসা একদম মসজিদের পাশে। এক মিনিটের পথ। বাসার চাবি, জুতা এসব মসজিদে রেখে পালিয়ে আসি। আফসানা জানান, আমরা ভয়ে পেছনে তাকাইনি। তাই ঘাতককে দেখতে পাইনি।

 

"