নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা

ঘাতক নির্বিকার বিচার শুরু

বিশ্বজুড়ে শোক-ক্ষোভ * দুই বাংলাদেশি নিহত, আহত ৫, নিখোঁজ ২

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে গত শুক্রবার ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় শোকে স্তব্ধ গোটা দেশ। হামলার পরদিন গতকাল শনিবার ঘাতক ব্রেন্টন ট্যারান্টকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তার মধ্যে কোনো বিকার বা অনুশোচনা লক্ষ করা যায়নি, বরং তিনি সাংবাদিকদের সামনে মুচকি হাসেন এবং বর্ণবাদের চিহ্ন প্রদর্শন করেন। ঘটনার পর থেকেই ক্রাইস্টচার্চে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং দেশ জুড়ে সব মসজিদ বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ও নিন্দা অব্যাহত রয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তার দেশের অস্ত্র আইনে পরিবর্তন আনা হবে। এদিকে, অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম গতকাল গভীর রাতে দেশে ফিরছেন বলে জানিয়েছেন বিসিবি।

তবে মসজিদে হামলা চালানো ব্রেন্টনের নামে আগের কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ আনা হবে। আগামী ৫ এপ্রিল আবারও তাকে আদালতে হাজির করা হবে। প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন এবং নিউজিল্যান্ডে বিক্ষিপ্ত সময় অতিবাহিত করেছেন। তাকে আমি দীর্ঘকালীন বাসিন্দা বলব না।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের শক্ত তদবিরের জোরে এর আগেও আইন কঠোর করার চেষ্টা ভেস্তে গেছে। অস্ত্র নিয়ে কাজ করা অনলাইন গানপলিসি ডট ওআরজির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ফিলিপ অ্যালপারস বলেন, নিউজিল্যান্ডে সম্ভাব্য অস্ত্রের মালিকের বয়স ১৬ বছরের বেশি হতে হয়। অ্যালপারস বলেন, নিউজিল্যান্ডে বন্দুক ব্যবসায়ীরা সংখ্যায় অল্প, তবে তারা খুব শক্তিশালী। সেই ১৯৯২ সালের পর থেকেই অস্ত্র আইন কঠোর করার চেষ্টা হচ্ছে। তবে বারবারই তারা সেই চেষ্টা ভন্ডুল করে দেয়।

ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলার ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউব ও টুইটারকে।

ক্রাইস্টচার্চে নিহত বাংলাদেশি আবদুস সামাদের স্ত্রী বেঁচে আছেন

হামলায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা তিন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর জানালেও পরে জানানো হয়েছে যে, মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। খবর বিবিসি।

নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের অনারারি কনসাল শফিকুর রহমান ভূঁইয়া গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. আবদুস সামাদের স্ত্রী জীবিত আছেন এবং নিউজিল্যান্ডে তাদের বাড়িতেই অবস্থান করছেন। আবদুস সামাদের ছেলে তারেক দূতাবাসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এ ছাড়া দুই বাংলাদেশির নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। গতকাল শনিবার ঢাকায় কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডি ক্যাবের এক অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

শাহরিয়ার বলেন, এ ঘটনার পর থেকে তিনজন বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন। আহত অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছেন আরো পাঁচজন। নিখোঁজরা হলেনÑ মোজাম্মেল হক, জাকারিয়া ভূঁইয়া ও শাওন। হাসপাতালে ভর্তি আছেন লিপি, মুনতাসীম, শেখ হাসান রুবেল, শাহজাদা আক্তার ও ওমর ফারুক। এদের মধ্যে লিপি ও মুনতাসীমের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

প্রবাসীদের তথ্য অনুযায়ী, ক্রাইস্টচার্চে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা সব মিলিয়ে পাঁচশর বেশি হবে না। যেকোনো তথ্য বা সাহায্যের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে সবাইকে।

জরুরি যোগাযোগের জন্য +৬১ ৪২৪ ৪৭২৫৪৪ এবং +৬১ ৪৫০১ ৭৩০৩৫ নম্বরে ফোন করতে বলা হয়েছে হাইকমিশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে।

বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া অব্যাহত

হামলার পরপর বিশ্বজুড়ে যে নিন্দার ঝড় ওঠে, এক দিন পরে হলেও গতকাল শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউজিল্যান্ডের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা এবং শুভ কামনা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘নিউজিল্যান্ডের জন্য যেকোনো কিছু করতে আমেরিকা পাশে আছে। ঈশ্বর সবার মঙ্গল করুন।’ ক্রাইস্টচার্চ শহরের মেয়র লিয়ানে ডালযেইল এই সন্ত্রাসবাদী কাজের প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন এবং আক্রান্তদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে মসজিদে প্রার্থনারত অবস্থায় বর্ণবাদী ঘৃণার বশবর্তী ব্যক্তির হামলার শিকার হওয়া এবং প্রাণ হারানো নিউজিল্যান্ডবাসীর জন্য তিনি শোকাহত। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো একে ‘অযৌক্তিক আক্রমণ’ উল্লেখ করে ফ্রান্সের অবস্থান ‘যেকোনো ধরনের চরমপন্থার বিরুদ্ধে’ বলে জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা

গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে এসে নগরীর পুলিশ বিভাগ হিসেবে পরিচিত, এনওয়াইপিডির কমিশনার জেমস ওনিল জানান, এখানে এ ধরনের ঘটনার সুযোগ অত্যন্ত কম। এর পরও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় গত শুক্রবার জুমার নামাজ শুরুর অনেক আগেই পুলিশ সদস্যরা অবস্থা নেন। অনেক এলাকায় রাস্তা বন্ধ করে নামাজ আদায়ের সুযোগ করে দেয় পুলিশ। মসজিদে গিয়ে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন স্থানীয় কংগ্রেসম্যান, সিনেটর সদস্যরা।

 

"