নিউজিল্যান্ডে মসজিদে গুলিতে নিহত ৪৯

৩ জন বাংলাদেশি * অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৯, ০২:০১

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার সময় মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে এক বন্দুকধারীর হামলায় ৪৯ জন নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই হামলায় অল্পের জন্য বেঁচে যান সে দেশে সফররত বাংলাদেশি ক্রিকেট টিমের সদস্যরা। তারা এখন নিরাপদে আছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন। হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আরডার্ন একে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ নির্মম ঘটনায় দেশ-বিদেশে বইছে তীব্র নিন্দার ঝড়।

হামলার পর বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে একটি গাড়ি থেকে। নিউজিল্যান্ডের কোথাও কোনো মসজিদে মুসলিমদের যেতে নিষেধ করেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে মসজিদগুলো আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। শহর জুড়ে পুলিশ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক ব্যক্তিরা ছাড়াও আর কেউ হামলায় জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, দুটি ঘটনাস্থল থেকেই কটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

নিউজিল্যান্ডের পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তিনজন পুরুষ ও একজন নারীকে আটক করা হয়েছে। আটকদের একজন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তিনি সন্দেহভাজন হামলাকারীকে ‘মৌলবাদী, অতি ডানপন্থি সহিংস সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

দূতাবাসের অনারারি কনসাল শফিকুর রহমান ভুঁইয়া জানিয়েছেন, নিহত তিন বাংলাদেশির পরিচয় সম্পর্কেই তারা নিশ্চিত হয়েছেন। হামলার ঘটনায় অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশের দূতাবাস এখন পর্যন্ত খবর পেয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। এ ছাড়া দুজন বাংলাদেশি নিখোঁজ ছিলেন। তবে তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন বলে দূতাবাস নিশ্চিত হয়েছে।

আল নুর নামের ওই মসজিদটি ডিন অ্যাভিনিউতে অবস্থিত এবং এটি হ্যাগলি পার্কের মুখোমুখি। এই মসজিদেই জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার কথা ছিল নিউজিল্যান্ড সফররত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যদের।

হ্যাগলি পার্কেই অনুশীলন করছিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। সেখানেই বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড দলের মধ্যকার তৃতীয় টেস্ট ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মুখপাত্র জালাল ইউনুস বলেছেন, বাসে করে দলের বেশির ভাগ সদস্যই মসজিদে গিয়েছিলেন এবং ঠিক যখন হামলার ঘটনাটি ঘটে, তখনই তারা মসজিদের ভেতর প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন।

তিনি সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, তারা নিরাপদে আছেন, কিন্তু মানসিকভাবে তারা ধাক্কা খেয়েছেন। আমরা তাদের হোটেল থেকে বের না হওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।

ক্যাথেড্রাল স্কয়ারে হাজারখানিক শিশুর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতে শোভাযাত্রা হওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা সর্বশক্তি নিয়ে কাজ করছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা : হামলায় বেঁচে যাওয়া নুর হামজা নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমে বলেছেন তার অভিজ্ঞতার কথা। তিনিও গিয়েছিলেন ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে। এর মধ্যে হঠাৎ করেই গুলি শুরু হয়ে যায়। রাইফেলের গুলি খেয়ে চোখের সামনে ঢলে পড়তে থাকেন একে একে মুসল্লিরা! ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান নুর। তিনি মালয়েশিয়ান বংশোদ্ভূত। মসজিদে প্রবেশপথের সামনে মৃতদেহের স্তূপ দেখেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

মোহন ইব্রাহীম নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড সংবাদপত্রকে বলেছেন, শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম এটা হয়তো বৈদ্যুতিক শকের কোনো ব্যাপার, কিন্তু একটু পরই সবাই দৌড়াতে শুরু করলেন। প্রত্যক্ষদর্শী কারো কারো মতে, হামলাকারী একাধিক ছিলেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফিলিস্তিনি জানান, তিনি একজনকে মাথায় গুলি করতে দেখেছেন। লোকজন দৌড়াতে শুরু করে। কারো কারো দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নামাজ আদায়রত অবস্থায় তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান। তিনি দৌড়ে মসজিদ থেকে পালিয়ে এসে দেখেন তার স্ত্রী ফুটপাতে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি শিশুদের গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন। অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গুলির শব্দ শোনার পর দেখেন চারজন মেঝেতে পড়ে আছেন। চারদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।

মসজিদটি হ্যাগলি ওভাল মাঠের কাছাকাছি হওয়ায় জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যরা অনুশীলন শেষে সেখানে নামাজ আদায়ের জন্য যাচ্ছিলেন। গতকাল অনুশীলনে লিটন দাস ও নাঈম হাসান ছাড়া দলের অন্য সবাই ছিলেন। ক্রিকেট দল মসজিদে প্রবেশের মুহূর্তে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে।

হামলার ভিডিও ভাইরাল : ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর পর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। এতে দেখা গেছে, ভিডিও গেমের মতো একজন বন্দুকধারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করছে। হামলার ভিডিও দেখে ধারণা করা হচ্ছে, বন্দুকধারী হামলার আগে পুরো ঘটনাটি ভিডিও করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। হয়তো তার মাথায় ভিডিও ক্যামেরা বসানো ছিল। একটি ওয়েবসাইট জানায়, হামলাকারী হামলাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করেছেন।

ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলাকারী স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে মসজিদের দিকে যাচ্ছেন। মসজিদের প্রবেশকক্ষ থেকেই মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে শুরু করে। মসজিদের ভেতর ছোটাছুটিরত মুসল্লিদের প্রতি টানা গুলি করতে থাকে সে। এরপর সে মসজিদের এককক্ষ থেকে অন্য কক্ষে ঘুরে ঘুরে গুলি করতে থাকে। গুলিবিদ্ধ হয়ে যারা মসজিদের মেঝেতে পড়েছিলেন, তাদের দিকে ফিরে ফিরে গুলি করছিল সে।

নিউজিল্যান্ডে এভাবে বন্দুক হামলার ঘটনা বিরল। ১৯৯০ সালে সাউথ আইল্যান্ডের আরামোয়ানা শহরে মানসিকভাবে অসুস্থ এক ব্যক্তি গুলি করে ১৩ জনকে হত্যার পর দেশটির অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কড়া করা হয়। ১৯৯২ সালে আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের ব্যাপারে দেশটির আইনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এরপরও ১৬ বছরের বেশি বয়সি কেউ নিরাপত্তা কোর্স সম্পন্ন করার পর নির্ধারিত মানের অস্ত্র নিবন্ধনের সুযোগ পান।

এই হামলার আগে আরেকবারও বিশ্ব শিরোনামে উঠে এসেছিল নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণের শহর ক্রাইস্টচার্চের নাম। ছোট্ট এই শহরে ২০১১ সালে আঘাত এনেছিল ভূমিকম্প। ওই সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। শহরের ঐতিহ্যবাহী ক্যাথেড্রাল (গির্জা) ভূমিকম্পে ধসে পড়ে।

সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড, স্টাফ ডট কো ডট এনজেড

 

"