গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় রাজশাহীবাসীর আতঙ্ক

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

রাজশাহী প্রতিনিধি

রাজশাহীতে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও সেটা পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নেই। জেলায় অনুমোদিত ১০৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সিলিন্ডার কেনাবেচা করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। অনুমোদন ছাড়াই এ ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে নগরীসহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ৫ শতাধিক দোকানে। এমন কোনো মোড় বা বাজার নেই যেখানে অনুমোদিত দোকান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার কেনাবেচা হয় না। আর গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও নেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও যন্ত্রপাতি। ফলে ক্রমেই বাড়ছে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে দুর্ঘটনার আতঙ্ক।

সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, এলপি গ্যাস বা সিএনজি গ্যাস কেনাবেচার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা নিয়মের তোয়াক্কা করে না। সতর্কের জায়গা প্রসারিত না করলে ভবিষ্যতে ঘটতে পারে বড় রকমের দুর্ঘটনা।

বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের রাজশাহী এরিয়া সেলস ম্যানেজার জিয়াউল হক বলেন,-মোংলা প্ল্যান্টে তাদের গ্যাসের সিল্ডিন্ডারগুলো পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া তৈরির পরে একটি সিলিন্ডার প্রায় ৩৫ বছর চলে। ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিলিন্ডারের রঙ নষ্ট বা অন্য সমস্যা হলে প্ল্যান্টে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঠিক করা হয়। অন্যদিকে, রাজশাহীর পরিবহনে সিএনজি গ্যাস সরবরাহ প্রতিষ্ঠান মেসার্স এনবি ফিলিং সিএনজি স্টেশনের দেয়ালে কয়েকটি উপদেশ লিখেই দায় সেরেছেন

তারা। গণপরিবহনের সিএনজি সিলিন্ডারগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।

রাজশাহীর বাসচালক রাব্বিসহ একাধিক পরিবহন চালকরাই বলছেন, গাড়ি কেনার পরে সিলিন্ডার লাগানো হয়েছে। তখন তারাই গাড়িতে সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে লাগিয়ে দেন। তারপরও কোনো ত্রুটি দেখা দিলে ওয়ার্কশপে মেরামত করে নেন।

তবে মেসার্স এনবি ফিলিং সিএনজি স্টেশনের ইঞ্জিনিয়ার ইমামের ভাষ্য, সিএনজি গাড়ির সিলিন্ডার চেক করার জন্য কোনো দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই। তাদের কাজ শুধু গ্যাস বিক্রি করা। চালকরা এসে গ্যাস নিয়ে চলে যায়। সিলিন্ডারে ত্রুটি আছে কি না তার দেখা হয় না। তিনি বলেন, পুলিশ রাস্তায় যেভাবে গাড়ি ধরে কাগজ দেখে, সেভাবে সিলিন্ডারেরও কাগজ দেখা উচিত।

এদিকে, নগরীসহ জেলার বিভিন্ন দোকানগুলোতেও গ্যাস সিলিন্ডার বেচাকেনা করলেও সিলিন্ডারগুলো ত্রুটিপূর্ণ কি না তা যাচাই করতে পারেন না। নগরীর কাজিহাটা এলাকার মেসার্স মাহমুদ এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটর রিয়াজুর রহমানের দাবি, রং নষ্ট বা কোনো ধরনের ত্রুটি থাকলে সেগুলো তিনি কেনাবেচা করেন না।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিস্ফোরক অধিদফতর পরিদর্শক ড. আসাদুল ইসলাম বৃহস্পতিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আজ পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় ১০৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস সিলিন্ডার কেনাবেচার অনুমতি দেওয়ার পরও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরো ৪২টি প্রতিষ্ঠানের।’

তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। পরীক্ষার প্রতিবেদন বগুড়া থেকে নিয়ে আসতে হয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে ব্যবহার ও বিক্রয়ের সব ক্ষেত্রে আরো সচেতন হতে হবে। তাহলেই অনেকাংশে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।’

সূত্র মতে, ২০১৩ সালের ১৪ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে ১৭বার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৪ জুলাই নগরীর চন্ডিপুর এলাকার একটি বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৯ জন আহত হয়। ২০১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বেলুন ফোলাতে গ্যাস ব্যবহারের সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সিভিল প্রশাসনের ইলেকট্রিশিয়ানসহ চারজন আহত হন। তার আগে ওই বছরের ২২ মে নগরীর মোল্লাপাড়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে মাইক্রোবাস (চট্ট মেট্রো-ট-১১-১১৩০) সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। তবে সে মুহূর্তে মাইক্রো থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে রক্ষা করেন চালক রুবেল হোসেন। এরপর ২০১৬ সালে ২১ ডিসেম্বর নগরীর হেতম খাঁ ছোট মসজিদ এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় ফায়সাল আলী নামে একজন আহত হয়। একই বছরের ৮ মে নগরীর কাজীহাটা এলাকায় দমকল বাহিনীর কর্মী ইমদাদ হোসেন গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত হন।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স রাজশাহীর উপপরিচালক (ডিডি) মো. নূরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের দফতরে গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো যন্ত্রপাতি নেই। যে কারণেই স্বাভাবিকভাবে সিলিন্ডারগুলো ত্রুটিপূর্ণ কি না তা জানার সুযোগ নেই।’

 

"