ডাকসু নির্বাচন

সমন্বয়হীনতায় শোভনের হার!

* ক্যাম্পাসে সাবেক নেতাদের সিন্ডিকেট * ভিপি পদের জন্য ভোট চাননি কেউ

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

হ জিয়াউদ্দিন রাজু

২৮ বছর পর আলো ছড়ানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন এখন চায়ের টেবিলের আলোচনায়, টেলিভিশনের টকশোতে। সেই সঙ্গে আলোচনায় ঘুরে-ফিরেই আসছে কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরের কাছে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের হারের বিষয়টি। ছাত্রলীগের একটি অংশের দাবি, অভ্যন্তরীণ কোন্দলই হারিয়েছে শোভনকে। আর অন্যরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা সিন্ডিকেটের কারণেই এ অবস্থা হয়েছে। তবে সব ছাপিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন হয়েও নেতাদের সমন্বয়হীনতায় ভিপি পদে পরাজিত হয়েছে ছাত্রলীগ; যার ফল গেছে নুরের ঘরে। ডাকসুতে ২৫টি পদের মধ্যে ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক ছাড়া বাকি ২৩ পদেই ছাত্রলীগের প্রার্থীরা জয় পেয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ আবাসিক হলেও ছাত্রলীগের প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। কোনো কোনো হলে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল নিয়েই জিতেছেন। কিন্তু ওই নির্বাচনে জিএস পদে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর থেকে ভিপি প্রার্থী ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা শোভন কেন কম ভোট পেলেন তা নিয়েই আলোচনা সব খানে।

ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীর চেয়েও কম ভোট পেয়েছেন। কোনো কোনো হলেও একই অবস্থা দেখা গেছে। কিন্তু একই প্যানেল হওয়ার পরও ভোটের ব্যবধানের বিষয়টি ছাত্রলীগের শোভনপন্থিরা মেনে নিতে পারেননি। এসব কারণে মঙ্গলবার দুপুরের আগ পর্যন্ত (ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের পর) ক্যাম্পাসের ভিসি ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে ভিপি পদে ফের নির্বাচন চান ছাত্রলীগের শোভনপন্থিরা। ওই বিক্ষোভে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকপন্থি কেউ যোগ দেননি।

এদিকে ছাত্রলীগের একটি পক্ষের দাবি, শোভনের পরাজয়ের জন্য সিন্ডিকেটই দায়ী। ছাত্রলীগের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে থাকা সিন্ডিকেটই শোভনকে হারিয়েছে। আবার ছাত্রলীগের ওই সূত্রটির দাবি, রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন সংগঠনের নেতৃত্বে এসেছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের ইচ্ছায়। ফলে সিন্ডিকেটের নেতারা তাকে শুরু থেকেই মেনে নিতে পারেননি। যার প্রভাব ডাকসু নির্বাচনের ফলে পড়েছে বলে দাবি করেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একাধিক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, হল কমিটি পুরনো। ওই কমিটি হয়েছিল ছাত্রলীগের গত কমিটির সোহাগ ও জাকিরের নেতৃত্বের সময়। ফলে বিভিন্ন হলের কমিটির নেতৃত্বে থাকা ছাত্রলীগের নেতারা ডাকসু নির্বাচনে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে ছাত্রলীগের প্যানেলে অন্য সবার জয় হলেও পরাজয় হয়েছে সংগঠনের শীর্ষ নেতার।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ভিপি পদে ছাত্রলীগের সভাপতির হারের কারণ আগের কমিটির নেতারা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ছাত্রলীগের আগের কমিটির অনুগতরা শোভনকে বিভিন্ন হলে সাহায্য করেনি। ছাত্রলীগের ওই সদ্য সাবেক শীর্ষ দুই নেতাই এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান ছাত্রলীগের আগের কেন্দ্রীয় কমিটিই বিভিন্ন হলে কমিটি করেছিল। এরপর বর্তমান নেতৃত্বে যারা এসেছেন তারা আর নতুন করে কমিটি করেননি। সেই হলের নেতারা শোভনের বিষয়ে ছিল বিমুখ। তারা ‘সিন্ডিকেটের’ পারপাস সার্ভে করেছে। কিন্তু শোভন পুরো প্যানেলের জন্য কাজ করেছেন, তিনি সবার জন্য ভোট চেয়েছেন। আর অন্যরা শুধুমাত্র নিজেদের ব্যক্তিগত ভোট চেয়েছেন। এ কারণেই শোভনের এমন পরাজয় হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ছাত্রলীগের হলের প্রার্থীরা কী কারণে একই হলে কেন্দ্রীয় ডাকসু প্যানেলের ভিপি প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন? এর কারণে এমন হতে পারে, কেন্দ্রীয় ভিপি প্রার্থীর জন্য তারা কেউ কাজ করেননি।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলোও বলছে একই কথা। কারণ হলগুলোতে ছাত্রলীগের প্যানেলের সবাই পাস করেছেন। জিএস ও এজিএস পদে ছাত্রলীগের গোলাম রব্বানী ও সাদ্দাম হোসাইন জিতেছেন। কিন্তু একই হলে শোভন পরাজয়ের মানে হলো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শোভনকে ভোট দেননি। ফলে সংগঠনে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

একক পক্ষে ভোট চাওয়া এবং সমন্বয়হীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে জিএস পদে জয়ী এবং ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেইন বলেন, আমরা অধিকাংশ পদে জয়ী হয়েছি। দুটি পদে আমরা জয়ী হতে পারিনি। কারণ প্রতিপক্ষ মৌলবাদী শক্তি মিথ্যা কথা চালিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছে। একই সঙ্গে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে মৌলবাদী অপশক্তি তৎপরতা চালিয়েছে। ফলে আমরা দুটি পদে জয়ী হতে পারিনি।

ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের ভিপি পদে হেরে যাওয়ার বিষয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আখতারুজ্জামান বলেন, নেতৃত্বের বিকাশ হয় সংকট থেকেই। এখন কিছু সংকট তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন বর্জনকারীদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন করলাম অর্জনের জন্য কিন্তু তারা বর্জন করছেন। তবে ভিপি পদে পরাজয়ের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

 

"