ডাকসুর আলোয় ধোঁয়ার কুণ্ডলী

* ফের ভোট দাবি করে আলটিমেটাম * নির্বাচন হবে না : ভিসি

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৯, ০২:০৭

জিয়াউদ্দিন রাজু

উত্তেজনা নিরসনের আভাস মিলেছিল মঙ্গলবার বিকেলে। ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরকে আলিঙ্গন করেন শুভেচ্ছাবিনিময়ের মধ্য দিয়ে। ভিপি নুরও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন। ছাত্রলীগের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার কথাও বলেন। কিন্তু সন্ধ্যায় বাম নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই নুরই সুর পাল্টে ডাকসুর সব পদে নতুন করে নির্বাচনের দাবি তোলেন। এতে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। আর পরের দিন এই দাবিতে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দেন। ফলে ২৮ বছর পর এই নির্বাচন নিয়ে ঢাবির পরিস্থিতি ঘোলাটে দেখছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এতে করে ধোঁয়ার কুন্ডলীতে আবছা হতে শুরু করেছে ডাকসুর আলো। এদিকে, এই পরিস্থিতির মধ্যেও নবনির্বাচিত ভিপি-জিএসকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ডাকসু ভবন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু ভবন নতুন রঙে সাজিয়ে রেখেছে। পারিপাটি করা হয়েছে ভিপি-জিএসসহ সবার সব কক্ষ। কক্ষগুলোর ভেতরে ডাকসু নথিপত্র রাখার আলমারি ও অন্যান্য আসবাবপত্রও সুসজ্জিত। ডাকসু সংগ্রহশালায় নতুন ভিপি-জিএসদের নাম লেখার জন্য আনা হয়েছে নতুন অনার বোর্ড।

শিক্ষার্থীদের মনে এখন প্রশ্নÑ কবে ভিপি-জিএস তাদের চেয়ার বসবেন? শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ শুরু করবেন? সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। তবে ডাকসু নির্বাচন আগামী শনিবারের মধ্যে বাতিলের দাবি জানিয়েছে নির্বাচন বর্জন করা পাঁচটি প্যানেল। পাশাপাশি পুনঃতফসিল ঘোষণার মাধ্যমে নতুন করে ভোটের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে তারা। বাম ও স্বতন্ত্র এবং কোটা সংস্কারসহ পাঁচটি প্যানেল এ দাবি করেন।

গতকাল বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জড়ো হয়ে তারা এ দাবি জানিয়েছেন। দাবি না মানা হলে আগামী রোববার থেকে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়েছেন তারা। তারা বলেন, আগামী শনিবারের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনকে বাতিল করতে হবে এবং তিন দিনের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের পুনঃতফসিল ঘোষণা করতে হবে। নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে বাদ দিয়ে সৎ ও নিরপেক্ষ শিক্ষকদের নির্বাচনের দায়িত্ব দিতে হবে। দাবি না মানলে তারা ১৭ মার্চ থেকে ক্যাম্পাসে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুশিয়ারি দেন।

অবস্থান কালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও ডাকসু নির্বাচনে জিএস প্রার্থী রাশেদ খান বলেন, আমরা পাঁচটি প্যানেল একত্রিত হয়েছি।

পরে ক্যাম্পাসে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন পাঁচ প্যানেলের প্রার্থীসহ তাদের সমর্থকরা। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন লিটন নন্দী, উম্মে হাবিবা বেনজীর, অরণি সেমন্তি খানসহ শতাধিক শিক্ষার্থী। বিক্ষোভ মিছিলটি ঢাবি উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়।

বিকাল ৩টার দিকে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে নবনির্বাচিত ভিপি নুরু বলেন, শিক্ষার্থীরা না চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকব। যারা আমাকে ভোট দিয়ে পাস করিয়েছেন তারা চাইলে আমি শপথ নেব, আর তারা না চাইলে শপথ নেব না।

নুর আরো বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাকে ভোট দিয়েছেন। তারা এই নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচন চায়। আমি তাদের দাবির পক্ষে একমত। আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একমত হয়ে সব পদে নির্বাচন চাই ৩১ মার্চের মধ্যে।

বেলা ২টার দিকে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করেন ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দল। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন পাঁচটি প্যানেলের নেতারা। এ সময় তারা ডাকসু নির্বাচন বাতিল ও পুনর্নির্বাচন দাবিতে উপাচার্যকে স্মারকলিপিও দেন।

এ সময় বামজোটের ছাত্রনেতা লিটন নন্দী বলেন, আমরা পুনর্নির্বাচনের দাবিতে উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, তার কাছে আমাদের দাবি-দাওয়াগুলো জানাই। আমরা তিন দিনের মধ্যে দাবি মেনে পুনঃতফসিল ঘোষণার আলটিমেটাম দিয়েছি। তবে ভিসি আমাদের কথা দেননি। উল্টো তিনি বলেছেন, যারা বিশ্ববিদ্যালয় বিশৃঙ্খলা করবে তাদের হাড়গোড় থাকবে না। তবে আমরা তাতে ভীত না। আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।

স্বতন্ত্র জোট থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকরী অরণি সেমন্তি খান বলেন, আমরা উপাচার্যের কাছ থেকে কোনো আশ্বাস পাইনি। আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। উপাচার্য আমাদের দাবি না শুনে উল্টো অনেক কথা শুনিয়ে দিয়েছেন।

তবে ডাকসু পুনর্নির্বাচন সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। একইসঙ্গে ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। উপাচার্য ভবনে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া পাঁচ প্যানেলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপের পর তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীল, সুশৃঙ্খল ও ভালো একটি একাডেমিক পরিবেশ বিরাজ করছে। এখানে কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা সহ্য করবে না। সবাইকে সে বিষয় সচেতন থাকতে আহ্বান জানাব। অপরাধমূলক কাজ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভোট বর্জন করা প্যানেলগুলোর দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করলে আখতারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন সফল করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর শ্রম-সময় ও মেধার যে খরচ হয়েছে, তার প্রতি অসম্মান জানাতে পারি না। তাদের শ্রমকে অসম্মান করার এখতিয়ার আমার নেই।

এ সময় ডাকসু নির্বাচনে নির্বাচিতদের অভিষেকের বিষয় তিনি বলেন, নিয়মনীতি অনুযায়ী সবকিছুর আয়োজন করা হবে।

 

"